একসময় ঘর সাজানোর অন্যতম পরিচিত উপকরণ ছিল বেতের আসবাব। বসার ঘরে বেতের চেয়ার, মোড়া কিংবা সোফা থাকলেই যেন ফুটে উঠত রুচি ও ঐতিহ্যের ছাপ। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে একসময় এই শিল্পের বেশ কদর ছিল। পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের ঘরেই দেখা মিলত হাতে তৈরি এসব পণ্যের। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের পছন্দ। প্লাস্টিক, ধাতব ও পারটেক্সের আসবাবের দাপটে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বেতের সেই পুরোনো বাজার।

মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিম বাজার ছিল এই শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। একসময় বাজারের বিভিন্ন দোকান ও কারখানায় ব্যস্ত সময় কাটাতেন বেতের কারিগরেরা। মোড়া, চেয়ার, সোফাসহ নানা ধরনের আসবাব তৈরিতে মুখর থাকত পুরো এলাকা। ক্রেতাদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন আর নেই। পশ্চিম বাজারে বেতের পণ্যের দোকান বলতে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র একটি—‘শিফা কেইন ফার্নিচার’।

ছোট এই দোকানটিতে অবশ্য এখনো ধরে রাখা হয়েছে বেতশিল্পের পুরোনো সৌন্দর্য। সেখানে দেখা যায় নকশা করা সোফা, হেলান দেওয়া চেয়ার, ঝুলন্ত দোলনা, বিভিন্ন আকৃতির মোড়া এবং ঘর সাজানোর নানা সামগ্রী। আধুনিক কারখানায় তৈরি আসবাবের বিপরীতে এসব পণ্যের বেশির ভাগই তৈরি হয় কারিগরের হাতে। ফলে প্রতিটি পণ্যে ফুটে ওঠে দেশীয় কারুশিল্পের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।

দোকানের মালিক শাহিন মিয়ার ভাষ্য, সাধারণ ক্রেতাদের আগ্রহ আগের তুলনায় অনেক কমেছে। এখন মূলত শখের বশে যারা দেশীয় ঐতিহ্য ধরে রাখতে চান এবং প্রবাস থেকে দেশে আসা মানুষজনই বেতের পণ্য কিনছেন। বিদেশে বসবাস করলেও অনেক প্রবাসী নিজেদের ঘরে দেশীয় আবহ তৈরি করতে এসব আসবাব নিয়ে যান। সময়ের সঙ্গে ব্যবসার ধরনও বদলেছেন শাহিন মিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পণ্যের প্রচার করে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনলাইন অর্ডার নেওয়ার পাশাপাশি পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন ক্রেতাদের কাছে।

বাজার সংকটের পাশাপাশি বেতশিল্পের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয়। আগের মতো সহজে ভালো মানের বেত পাওয়া যায় না। ফলে বাইরে থেকে বেশি দামে কাঁচামাল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাচ্ছে পণ্যের দাম। বিপরীতে বাজারে কম দামে পাওয়া যাচ্ছে প্লাস্টিক ও ধাতব আসবাব। হাতে তৈরি বেতের পণ্যকে এসব সস্তা বিকল্পের সঙ্গে দামে টেক্কা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি দক্ষ কারিগরের অভাব। দীর্ঘ সময় ও পরিশ্রম দিয়ে বেতের পণ্য তৈরি করলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই অনুযায়ী আয় হয় না। কাজের নিশ্চয়তাও না থাকায় পুরোনো অনেক কারিগর পেশা বদলে অন্য কাজে যুক্ত হয়েছেন। নতুন প্রজন্মও এই পেশায় আগ্রহী না হওয়ায় তৈরি হয়েছে কারিগর সংকট। ফলে একের পর এক দোকান ও ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বাজার তৈরি, কারিগরদের টিকিয়ে রাখা এবং কাঁচামালের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ না এলে মৌলভীবাজারের এই ঐতিহ্যবাহী বেতশিল্পও হারিয়ে যেতে পারে।

- প্রথম আলো