ঋণের বোঝায় যখন দিশেহারা হওয়ার উপক্রম, তখনই মিলল স্বস্তির খবর। সুদে-আসলে কৃষিঋণের পুরো দায় থেকে মুক্তি পেয়েছেন দেশের ১৪ লাখেরও বেশি প্রান্তিক কৃষক। সরকারের এই উদ্যোগে মুছে যাচ্ছে দীর্ঘদিনের দুশ্চিন্তা, নতুন করে স্বপ্ন বুনছেন কৃষকেরা। কারও কাছে বিক্রি করতে হয়নি শেষ সম্বল, কারও কাঁধ থেকে নেমেছে বছরের পর বছর বয়ে বেড়ানো ঋণের বোঝা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই কর্মসূচিতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণের সম্পূর্ণ আসল ও সুদ মওকুফ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের বিপরীতে সরকার পরিশোধ করেছে ১ হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ঋণখেলাপি হওয়ার কারণে যারা নতুন করে ব্যাংকঋণ পাচ্ছিলেন না, তাদের জন্য খুলছে আবারও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার সুযোগ। ফলে চড়া সুদের মহাজনি ঋণের ওপর নির্ভরতা কমার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
এই স্বস্তির বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে যশোরের কৃষকদের অভিজ্ঞতায়। ১০ হাজার টাকা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে বাড়ির গাছ কিংবা গোয়ালের গরু বিক্রির চিন্তা করেছিলেন কৃষক ফারুক হোসেন। ঋণ মওকুফ হওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়নি কোনো সম্পদ। একইভাবে ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য না থাকায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটানো মহিউদ্দিনের কাছেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত যেন নতুন করে বেঁচে থাকার আশ্বাস। তাদের মতো অসংখ্য কৃষকের জীবনে ফিরেছে আর্থিক স্বস্তি।
তবে এই উদ্যোগের প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত স্বস্তিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ। অর্থনীতিবিদদের মতে, কৃষকের আর্থিক সক্ষমতা বাড়লে উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে কেবল ঋণ মওকুফই যথেষ্ট নয়; উৎপাদন খরচ কমানো, কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা এবং প্রয়োজনীয় ভর্তুকি নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ, দেশীয় কৃষি শক্তিশালী না হলে খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়বে, যা আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতায় বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এদিকে কৃষিঋণ বিতরণেও বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বেশি। এর আগের অর্থবছরেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। অর্থাৎ কৃষকের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার পাশাপাশি কৃষি খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে ঋণ মওকুফের এই উদ্যোগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চারের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, খেলাপি ঋণের বোঝা থেকে মুক্ত হয়ে কৃষকেরা আবারও ফিরবেন ব্যাংকিং ব্যবস্থায়, বাড়বে নতুন বিনিয়োগ ও উৎপাদন। তবে এই স্বস্তিকে দীর্ঘস্থায়ী করতে প্রয়োজন কৃষকের পাশে ধারাবাহিকভাবে থাকা। কারণ, কৃষকের মুখে হাসি ফুটলেই শক্তিশালী হবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, আর সেই ভিত্তির ওপরই এগিয়ে যাবে গ্রামীণ অর্থনীতি।