উচ্চশিক্ষায় মেধা ও অসাধারণ একাডেমিক কৃতিত্বের স্বীকৃতি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাচ্ছেন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৬৯ শিক্ষার্থী। দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পর একসঙ্গে ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালের জন্য এ পদক দেওয়া হচ্ছে। এবার ৩৬টি সরকারি ও পাঁচটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সহ মোট ৪১টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এ সম্মাননার জন্য মনোনীত হয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) প্রকাশিত চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ১৭৮, ২০২০ সালে ১৪১ এবং ২০২১ সালে ১৫০ শিক্ষার্থী এ পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে ২২ ক্যারেট মানের ৪ দশমিক ৫ গ্রাম স্বর্ণ ও ১০ গ্রাম রৌপ্য দিয়ে তৈরি একটি পদক এবং সম্মাননাপত্র দেওয়া হবে।
ইউজিসি সূত্র জানিয়েছে, পদক প্রদান অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণের জন্য ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনো অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও মনোযোগী করা এবং ভালো ফল অর্জনে উৎসাহিত করতে ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এ স্বর্ণপদক চালু করেন। শুরুতে শুধু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এ পুরস্কারের আওতায় ছিলেন। পরে ২০১৮ সালে নীতিমালা সংশোধন করে স্থায়ী সনদপ্রাপ্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও এ সম্মাননার আওতায় আনা হয়।
যেভাবে মনোনীত হন শিক্ষার্থীরা
ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী, স্নাতক পর্যায়ে বিভিন্ন অনুষদে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রাথমিকভাবে যোগ্য শিক্ষার্থীদের নাম পাঠায়। পরে ইউজিসি যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করে।
সর্বশেষ ২০২০ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৮ দেওয়া হয়েছিল। এরপর আর কোনো আয়োজন না হওয়ায় ২০১৯, ২০২০ ও ২০২১ সালের পদক একসঙ্গে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন পদক
এবারের তালিকায় ঢাকা, রাজশাহী, বাংলাদেশ কৃষি, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি (বুয়েট), চট্টগ্রাম, জাহাঙ্গীরনগর, ইসলামী, জগন্নাথ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, খুলনা, জাতীয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত, বাংলাদেশ মেডিকেল, গাজীপুর কৃষি, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কুমিল্লা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস, সিলেট কৃষি, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বেগম রোকেয়া, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বাংলাদেশ টেক্সটাইল, বরিশাল, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এ সম্মাননা পাচ্ছেন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে আহ্ছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ইস্ট ওয়েস্ট, প্রিমিয়ার, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি।
তিন বছরের তালিকায় কতজন
ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭৮ শিক্ষার্থী স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হন। ওই বছরের তালিকায় রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রিমিয়ার, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির কোনো শিক্ষার্থী ছিলেন না।
২০২০ সালে ৩৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪১ শিক্ষার্থী মনোনীত হন। ওই বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, ইসলামী আরবি এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী তালিকায় স্থান পাননি। তবে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নতুন করে তালিকায় যুক্ত হয়।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে ৩৭টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫০ শিক্ষার্থী মনোনীত হন। ওই বছর গাজীপুর কৃষি, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী তালিকায় ছিলেন না। তবে রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রিমিয়ার, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থীরা তালিকায় স্থান পান।
শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করবে স্বর্ণপদক
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন যুগান্তরকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করে শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। তার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৬ শিক্ষার্থী প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক পাচ্ছেন। এ ধরনের স্বীকৃতি শিক্ষার্থীদের আরও ভালো ফলাফল অর্জনে উৎসাহিত করবে বলে মনে করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন করে স্বর্ণপদক দেওয়ায় সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা ও একাডেমিক কৃতিত্বের যথাযথ মূল্যায়ন হবে। প্রতিবছর এ ধারা অব্যাহত থাকবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।
আপত্তি জানানো যাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত
ইউজিসি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মনোনীত প্রার্থীদের আবেদন যাচাই-বাছাই করে প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে পুনরায় যাচাইয়ের পর ৪৬৯ শিক্ষার্থীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
তালিকা নিয়ে কোনো আপত্তি বা মতামত থাকলে প্রয়োজনীয় প্রমাণসহ ৩১ অক্টোবরের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ইউজিসির রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড বিভাগের পরিচালকের কাছে লিখিতভাবে অথবা নির্ধারিত ই-মেইলে জানাতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পর কোনো অভিযোগ গ্রহণ করা হবে না।
ইউজিসির রিসার্চ গ্রান্টস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ড বিভাগের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ওমর ফারুখ বলেন, স্বর্ণপদক প্রদান অনুষ্ঠানের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে জানুয়ারির শেষ দিকে অথবা ফেব্রুয়ারির শুরুতে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী আরও তিন বছরের জন্য স্বর্ণপদকের যোগ্য শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে।
দীর্ঘ বিরতির পর একসঙ্গে তিন বছরের পদক প্রদানের এ উদ্যোগ মেধাবী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিয়মিতভাবে এ আয়োজন অব্যাহত থাকলে উচ্চশিক্ষায় ভালো ফল অর্জনে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।