গরিব দেশের মানুষ হয়েও আজ জাতিসংঘের চেয়ারে
বাংলাদেশ, যে দেশ একসময় ছিল পশ্চিমাদের দখলে। যে দেশের মানুষ নিজেরা হাড়ভাঙা পরিশ্রম করত, আর তার ফল ভোগ করত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তান। তারও আগে ব্রিটিশরা সহ নানা শক্তিধর দেশ এ দেশকে নিজেদের আঙুলের ডগায় নাচিয়েছে। কিন্তু শুধু শোষণে ক্ষান্ত হয়নি তারা, পরিশ্রমের বিনিময়ে এ দেশের মানুষ পেয়েছিল শুধুই অত্যাচার, লাঞ্ছনা, অপমান আর না খেয়ে মরে যাওয়ার নির্মম নিয়তি। এমনকি ঢাকার মসলিনের মতো দক্ষ কারিগরদের আঙুল কেটে দেওয়ার মতো নৃশংস ইতিহাসও জড়িয়ে আছে এই মাটির সাথে।
ভৌগোলিক অবস্থানে বাংলাদেশ শুধু একটা দেশ নয়, বরং এটি পৃথিবীর বুকে বৃহত্তম ব-দ্বীপ! যার আয়তন মাত্র ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার হলেও জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। নানা সময়ে অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হওয়া এই দেশ, যার শিক্ষার হার বর্তমানে প্রায় ৭৭ শতাংশ আজ সেই সাধারণ দেশেরই একজন যোগ্য প্রতিনিধি খলিলুর রহমান নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতিসংঘের মতো বিশ্বমঞ্চে! শত না পাওয়ার মাঝেও এটি যেন বাঙালি জাতির জন্য এক অবিস্মরণীয় ও বিশাল প্রাপ্তি।বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চে এবার নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশেরই একজন প্রতিনিধি । জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান । শত না পাওয়ার মাঝেও এই অর্জন যেন বাঙালি জাতির জন্য এক বিশাল ও অবিস্মরণীয় প্রাপ্তি।
দায়িত্ব নিয়েই তিনি জানিয়ে দিয়েছেন আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বাংলাদেশ সরকারের মনোনয়নের জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ন্যায়, স্বাধীনতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন। আট দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে দূরে রাখতে জাতিসংঘ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। শরণার্থী সহায়তা, শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জেও কাজ করছে সংস্থাটি।
তবে সংকটও কম নয়। বিশ্বজুড়ে সংঘাত, মানবিক বিপর্যয়, দুর্বল উন্নয়ন অগ্রগতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমছে। আর সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সংলাপ, সহযোগিতা ও বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন নতুন সভাপতি। আগামী এক বছরে ছয়টি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পদক্ষেপ, মানবাধিকার, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার।
এই বিশ্বমঞ্চে বিশেষভাবে উঠে এসেছে বাংলাদেশের অবদানও। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশির অবদান এবং মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল যেন শুধু কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেজন্য ডিজিটাল বৈষম্য কমানো এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ওপরও দেওয়া হয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। আর সবশেষে এসেছে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা আস্থা চাইলেই পাওয়া যায় না, আস্থা অর্জন করতে হয়। সিদ্ধান্ত, প্রতিশ্রুতি আর মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন এসবের মাধ্যমেই জাতিসংঘকে আবারও বিশ্ববাসীর আস্থা অর্জন করতে হবে।
Comments
Be the first to comment.