দীর্ঘদিনের সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার অবসান ঘটিয়ে সাত কলেজকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ডিসিইউ)। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল—পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে গতি আসবে, একাডেমিক কার্যক্রমে সমন্বয় বাড়বে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হবে আরও কার্যকর। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও নানা একাডেমিক ও প্রশাসনিক জটিলতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি শিক্ষার্থীদের।

প্রত্যাশার জায়গায় বাস্তবতা যেন ভিন্ন গল্প বলছে।

শিক্ষা কার্যক্রমে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসার আগেই বারবার বদল হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ প্রশাসনে। একজন উপাচার্য দায়িত্ব নিচ্ছেন, আবার কিছুদিনের মধ্যেই পরিবর্তন হচ্ছে নেতৃত্ব। এতে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে—পরিবর্তন কি শুধু প্রশাসনের শীর্ষ পদে, নাকি এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমেও?

পরিবর্তন হচ্ছে ভিসি, পরিবর্তন হচ্ছে না বাস্তবতা

সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি ছিল একটি স্বতন্ত্র ও কার্যকর একাডেমিক কাঠামো। সেই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পর তারা আশা করেছিলেন, এবার শিক্ষাজীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে।

কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরও পরীক্ষা, ফলাফল, একাডেমিক ব্যবস্থাপনা, ব্যাচভিত্তিক অবস্থান ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি।

সমস্যা সমাধান হচ্ছে, নাকি শুধু চেয়ার বদলাচ্ছে?

২৬ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলামকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করা হয়। একই দিনে অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যখন নিজের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাঠামো শক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, তখন নেতৃত্বে এ ধরনের পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন কোথায়?

সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের তালিকায় রয়েছে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশে বিলম্ব, প্রশাসনিক জটিলতা, একাডেমিক কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিশ্চয়তা।

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার পর এসব সমস্যার সমাধানে দৃশ্যমান পদক্ষেপের প্রত্যাশা ছিল শিক্ষার্থীদের। কিন্তু প্রশাসনের শীর্ষ পদে পরিবর্তন হলেও যদি মূল সমস্যাগুলোর সমাধান দৃশ্যমান না হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠছে—শুধু উপাচার্য পরিবর্তনেই কি শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমবে?

এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর

প্রশাসনিক পরিবর্তন কাগজে একটি সিদ্ধান্ত হলেও এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে সরাসরি পড়ে।

একজন শিক্ষার্থী জানেন না, তার পরীক্ষা নির্ধারিত সময়ে হবে কি না।
কেউ জানেন না, ফলাফল কবে প্রকাশ হবে।
কেউ জানেন না, তার ব্যাচ কোন একাডেমিক কাঠামোর অধীনে চলবে।
পুরোনো ব্যাচগুলোর মাইগ্রেশন নিয়েও রয়েছে আইনি জটিলতা।

একটি পরীক্ষা পিছিয়ে গেলে শুধু একটি তারিখ পিছোয় না; এর প্রভাব পড়ে ফল প্রকাশ, পরবর্তী বর্ষ, চাকরির আবেদন ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির ক্ষেত্রেও। দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, পুরোনো ভোগান্তি?

ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি আইন, ২০২৬-এ বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম, পরীক্ষা, পাঠ্যক্রম ও সনদ প্রদানের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ আইনি কাঠামোর দিক থেকে নতুন একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

তবে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, কাঠামো তৈরি হওয়ার পরও যদি পরীক্ষা, ফলাফল, সনদ, মাইগ্রেশন ও একাডেমিক কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুফল তারা কবে পাবেন?

তাদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম বা প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিক্ষাব্যবস্থায় দৃশ্যমান ও কার্যকর পরিবর্তন।

ভিসি পরিবর্তনের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি

নতুন উপাচার্য নিয়োগের পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা নতুন ভিসির নিয়োগ বাতিল এবং আগের উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে। এ দাবিতে ২৭ সেপ্টেম্বর ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন এবং বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণাও এসেছে।

তবে ভিসি পরিবর্তনের বাইরে শিক্ষার্থীদের বড় দাবি একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা। তাদের প্রত্যাশা—

সময়মতো পরীক্ষা,
সময়মতো ফলাফল,
স্পষ্ট একাডেমিক কাঠামো,
সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত,
ব্যাচভিত্তিক সমস্যার সমাধান
এবং একটি নির্ভরযোগ্য বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থা।