ভারতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রথম অনুমোদন পেয়েছে জাপানের তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালের তৈরি টিকা ‘কিউডেঙ্গা’। ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সীদের জন্য উপযোগী এই টিকাটি তিন মাসের ব্যবধানে দুই ডোজে নিতে হয়। ভ্যাকসিন নেওয়ার পূর্বে ডেঙ্গু সংক্রমণের ইতিহাস পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় হাসপাতালে ভর্তি ঠেকাতে এটি ৯০.৪% কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। ড. রেড্ডিস ল্যাবরেটরিজের মাধ্যমে ২০২৭ সালের শুরুতে ভারতের বেসরকারি বাজারে এটি আসবে, যা প্রচলিত মশক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ডেঙ্গুর বৈশ্বিক লড়াইকে আরও শক্তিশালী করবে।

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ রূপ নেওয়া ডেঙ্গু মহামারি রুখতে এক বড় ধরনের সাফল্য এসেছে। ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (CDSCO) দেশটিতে ব্যবহারের জন্য প্রথম ডেঙ্গু টিকা ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga)-র অনুমোদন দিয়েছে। জাপানি প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি এই লাইভ-অ্যাটেনুয়েটেড (দুর্বল করা ভাইরাসভিত্তিক) ভ্যাকসিনটি ভারতে প্রচার ও সরবরাহের জন্য স্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা ড. রেড্ডিস ল্যাবরেটরিজের সাথে চুক্তি হয়েছে। প্রয়োজনীয় সকল আইনি ও আমদানিসংক্রান্ত প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৭ সালের প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই ভারতের ফার্মেসিগুলোতে এটি সহজলভ্য হবে।

কিউডেঙ্গার বৈশিষ্ট্য ও প্রয়োগবিধি

কিউডেঙ্গা মূলত ডেঙ্গুর চারটি প্রধান ভ্যারিয়েন্টের (Serotypes 1-4) বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম।

  • উপযোগী বয়স: ৪ থেকে ৬০ বছর বয়সী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা এই টিকা নিতে পারবেন।

  • ডোজের মাত্রা: ভ্যাকসিনটি ৩ মাসের ব্যবধানে মোট ২টি ডোজে প্রয়োগ করতে হয়।

  • সহজ প্রয়োগ পদ্ধতি: অন্যান্য কিছু ভ্যাকসিনের মতো এটি নেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করে আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না—তা যাচাই করার প্রয়োজন পড়ে না।

কতটা কার্যকর এই টিকা?

ব্যাপক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের তথ্যানুযায়ী, কিউডেঙ্গা গ্রহণকারীদের শরীরে ডেঙ্গুর লক্ষণভিত্তিক সংক্রমণ গড়ে ৮০.২% পর্যন্ত প্রতিরোধ করা গেছে (দ্বিতীয় ডোজের এক বছর পর)। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার ১৮ মাস পর দেখা গেছে—ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঝুঁকি এটি প্রায় ৯০.৪% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। তবে যেকোনো টিকার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবেশ ও ব্যক্তির শারীরিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে কার্যকারিতার কিছুটা তারতম্য হতে পারে।

ভারত ও বিশ্বজুড়ে ডেঙ্গুর চিত্র

ভারতে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে এডিস মশার প্রজনন বাড়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ মারাত্মক রূপ নেয়। দেশটির প্রাথমিক পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে ১ লাখ ১৩ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং এতে প্রাণ হারান ৯৫ জন। তার আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩২ হাজারেরও বেশি।

বিশ্বজুড়ে ইতোমধ্যে ৪৩টিরও বেশি দেশে অনুমোদিত এই টিকার ৩ কোটি ২০ লাখেরও বেশি ডোজ বিতরণ করা হয়েছে। তাকেদা জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী ডেঙ্গু মোকাবিলায় তারা উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি বছর ১০ কোটি ডোজ তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

মনে রাখা জরুরি

ভারতে শুরুতে টিকাটি বেসরকারিভাবেই পাওয়া যাবে; পরবর্তীতে সরকারি টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হবে কি না তা দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে চিকিৎসকদের মতে, কিউডেঙ্গা ডেঙ্গু সুরক্ষায় বড় অস্ত্র হলেও বাসাবাড়িতে পানি জমে থাকা রোধ, এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস এবং মশার কামড় থেকে বেঁচে থাকার মতো প্রাথমিক নিয়মগুলো মেনে চলা সমানভাবেই গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।