কোন এক সোময় যে যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতিই শত্রুপক্ষের মনে আতঙ্ক সৃষ্টি করত, আজ সেই বিশাল মার্কিন রণতরীর শরীরেই স্পষ্ট মরিচার ছাপ। এমনকি একজন নাবিক সমুদ্রে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।প্রায় এক হাজার একশো ফুট দীর্ঘ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন থাইল্যান্ডের লায়েম চাবাং বন্দরে পৌঁছানোর পর এর বাহ্যিক অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়েছেন অনেক পর্যবেক্ষ। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এটি কি মার্কিন নৌবাহিনীর রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতির প্রমাণ, নাকি এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ও কঠিন সামুদ্রিক অভিযানের স্বাভাবিক পরিণতি ।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে মার্কিন নৌবাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর সান ডিয়েগো ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরুর পর আব্রাহাম লিংকন টানা ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটিয়েছে। নিমিটজ শ্রেণির এই বিশাল বিমানবাহী রণতরীতে তিন দফা দায়িত্ব পালন করেছেন মার্কিন নৌবাহিনীর সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল সুস্টার। তাঁর মতে, কোনো যুদ্ধজাহাজ যদি একটানা ৬০ দিন বা তার বেশি সময় সক্রিয়ভাবে সমুদ্রে থাকে, তাহলে জলরেখার আশপাশে মরিচা দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। আর যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেই মরিচা পরিষ্কার করার সুযোগও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
একটি যুদ্ধজাহাজের মরিচা পরিষ্কার করা সাধারণ কোনো কাজ নয়। ক্রুদের জলরেখা পর্যন্ত নামিয়ে ধাতব অংশ ঘষে ঘষে মরিচা অপসারণ করতে হয়। তারপর দিতে হয় দুই স্তর মরিচা প্রতিরোধক উপাদান। এর পরেও শেষ হয় না কাজ প্রয়োজন হয় আরও দুই স্তর বিশেষ নৌবাহিনীর ধূসর রঙের প্রলেপ।তাই বলা যায় যখন একটি যুদ্ধজাহাজকে প্রতিনিয়ত সামরিক অভিযানে থাকতে হচ্ছে, তখন এত দীর্ঘ রক্ষণাবেক্ষণের সুযোগ পাওয়া কঠিন। কার্ল সুস্টারের হিসাব অনুযায়ী, পুরো জাহাজের মরিচা দূর করে প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষ করতে অন্তত ৩০ দিন সময় লাগতে পারে। এর মধ্যে বিশেষ নজর থাকবে জাহাজের সামনের ধনুকের মতো বাঁকানো অংশে। কারণ সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এবং নোনা পানির সবচেয়ে বেশি ধাক্কা সামলাতে হয় জাহাজের এই অংশকে। কারণ জাহাজ চলমান অবস্থায় সেখানে গিয়ে কাজ করা প্রায় অসম্ভব।
সাবেক ক্যাপ্টেন কার্ল সুস্টারের মতে, এই মরিচাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। কারণ সময়ের সঙ্গে মরিচা ধাতব কাঠামোর আরও গভীরে প্রবেশ করে সেটিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ডেকের চলাচলের পথ, নিরাপত্তার দড়ি কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই মরিচা অপসারণ করা জরুরি। কারণ আজকের ছোটখাটো ক্ষয় যদি অবহেলা করা হয়, সেটিই আগামী দিনে বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আর এটিই এখন নৌবাহিনীর জন্য অন্যতম বড় রক্ষণাবেক্ষণ চ্যালেঞ্জ। মজার বিষয় হলো, এই কাজটি নৌসদস্যদের কাছেও মোটেও পছন্দের নয়। সাবেক কর্মকর্তা সুস্টার জানিয়েছেন, নৌবাহিনীতে নাবিকদের সবচেয়ে অপছন্দের কাজগুলোর একটি হলো মরিচা ঘষে পরিষ্কার করা। আরেকটি অপছন্দের কাজ হলো জাহাজের পাইপ ও নর্দমা পরিষ্কার করা।
কিন্তু যুদ্ধজাহাজ যত আধুনিকই হোক, যত শক্তিশালী অস্ত্রেই সজ্জিত থাকুক, শেষ পর্যন্ত মরিচার এই পুরোনো সমস্যার হাত থেকে তারও পুরোপুরি মুক্তি নেই। এখন সামনে একটাই বড় প্রশ্ন মাসের পর মাসের সামরিক অভিযান, ২৮৬ দিনের সমুদ্রযাত্রা এবং একের পর এক দায়িত্ব পালনের পর আব্রাহাম লিংকন যখন আবার গভীর সমুদ্রে ফিরে যাবে, তখন কি তার গায়ে দেখা যাবে নতুন রঙের ঝকঝকে আবরণ? নাকি এই মরিচার দাগগুলোই হয়ে থাকবে তার দীর্ঘ যুদ্ধযাত্রার নীরব স্মৃতি?