প্রেমের টানে বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে দূর আফ্রিকার দুর্গম প্রান্তে পাড়ি জমিয়েছিলেন এক সুইস নারী। সাজানো-গোছানো জীবন, ব্যবসা, স্বাচ্ছন্দ্য সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি বিয়ে করেছিলেন সাম্বুরু সম্প্রদায়ের এক যোদ্ধাকে। শুরুটা ছিল যেন মুগ্ধ করে দেওয়া এক রূপকথার গল্প। কিন্তু যে ভালোবাসার টানে তিনি নিজের পুরো পৃথিবী বদলে ফেলেছিলেন, মাত্র চার বছর পর সেই সংসারেই নেমে আসে ভাঙনের ছায়া।
করিন হফম্যান ছিলেন সুইজারল্যান্ডের একজন সফল ও আকর্ষণীয় নারী। নিজের বুটিক ব্যবসা, গাড়ি-বাড়ি আর আরাম-আয়েশে ভরা সুন্দর জীবন সবই ছিল তার। কিন্তু ১৯৮৬ সালে কেনিয়ায় বেড়াতে গিয়ে বাসের জানালা দিয়ে হঠাৎ সাম্বুরু যোদ্ধা লাতিঙ্গাকে দেখতে পান তিনি। সেই এক ঝলক দেখাই যেন তার মনে গভীর এক আলোড়ন তোলে। প্রথম দেখাতেই লাতিঙ্গার প্রতি মুগ্ধ হয়ে পড়েন করিন। অচেনা সেই মানুষটির উপস্থিতি এতটাই গভীরভাবে তাকে নাড়া দিয়েছিল যে, এরপর তার জীবনের পথই বদলে যায়। সেই আবেগের টানেই সুইজারল্যান্ডে ফিরে নিজের শুধু ব্যবসাই নয়, পুরোনো প্রেমিকের সঙ্গেও সম্পর্ক ছিন্ন করেন। আধুনিক শহুরে জীবনের সব আরাম, স্বাচ্ছন্দ্য আর বিলাসবহুল পরিবেশ ছেড়ে তিনি পাড়ি জমান কেনিয়ার দুর্গম এলাকায়। প্রায় তিন মাস ধরে খোঁজার পর অবশেষে সেই মানুষটির সন্ধান পান করিন।
এরপর স্থানীয় আদিবাসী প্রথা মেনে লাতিঙ্গাকে বিয়ে করেন করিন। শুরু হয় সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন। যে নারী এতদিন আধুনিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলেন, তাকেই এবার থাকতে হলো ছোট্ট একটি কুঁড়েঘরে। সেখানে ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না সুবিধাজনক পানির ব্যবস্থা, এমনকি আধুনিক চিকিৎসার সুবিধাও ছিল না। চারপাশের জীবনযাপন, সংস্কৃতি ও পরিবেশ ছিল তার পরিচিত পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও ভালোবাসার টানে এই কঠিন বাস্তবতাকেও স্নিগ্ধ হাসিতে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন করিন। সময়ের সঙ্গে তাদের সংসারে আসে আরও আনন্দের মুহূর্ত। একসময় তাদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। মনে হচ্ছিল, এত ত্যাগ আর এত পথ পেরিয়ে অবশেষে হয়তো নিজের কাঙ্ক্ষিত সুখের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছেন করিন। কিন্তু রূপকথার গল্পের মতো শুরু হওয়া এই সংসারে ধীরে ধীরে জমতে থাকে অস্বস্তির মেঘ।
স্বাধীনচেতা করিন সংসারে কিছুটা স্বচ্ছলতা আনতে জঙ্গলে একটি ছোট দোকান খোলেন। আর এই দোকানই ধীরে ধীরে লাতিঙ্গার সঙ্গে তার সম্পর্কে নতুন সংকট তৈরি করে। কোনো খদ্দেরের সঙ্গে করিন হাসিমুখে কথা বললেও তা মেনে নিতে পারতেন না লাতিঙ্গা। তার মনে জন্ম নেয় সন্দেহ। একপর্যায়ে তিনি এমন প্রশ্নও তোলেন করিনের সন্তানটি আদৌ তার কি না। যে সম্পর্ক একদিন প্রথম দেখাতেই করিনকে মুগ্ধ করেছিল, সেই সম্পর্কের ভেতরেই এবার ঢুকে পড়ে অবিশ্বাস আর মানসিক চাপ। সংসারের প্রতিটি দিন ধীরে ধীরে তার কাছে কঠিন হয়ে উঠতে থাকে। চারপাশের অপরিচিত পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামের পাশাপাশি সম্পর্কের এই টানাপোড়েনও তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিতে থাকে।
অবশেষে করিন বুঝতে পারেন, আবেগের টানে নেওয়া সিদ্ধান্ত আর বাস্তব জীবনের কঠিন সত্য এক জিনিস নয়। শেষ পর্যন্ত বিয়ের চার বছর পর, ১৯৯০ সালে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে কেনিয়া ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে ফিরে আসেন তিনি। যে নারী একদিন ভালোবাসার জন্য নিজের পুরো পৃথিবী ছেড়ে আফ্রিকায় গিয়েছিলেন, তাকেই শেষ পর্যন্ত মেয়েকে নিয়ে ফিরে আসতে হয় নিজের পরিচিত পৃথিবীতে। পরে নিজের এই অদ্ভুত, আবেগঘন ও কঠিন অভিজ্ঞতা নিয়ে করিন লেখেন ‘দ্য হোয়াইট মাসাই’ বইটি। তার জীবনের এই অবিশ্বাস্য গল্প বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। বইটি বেস্টসেলার হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে তার জীবনকাহিনি নিয়ে নির্মিত হয় একটি জনপ্রিয় সিনেমাও।
তবে গল্পের শেষটাও কিছুটা অপ্রত্যাশিত। করিন চলে যাওয়ার পর লাতিঙ্গা আর তার কোনো খোঁজ রাখেননি। কিন্তু বহু বছর পর সাবেক স্ত্রীর সঙ্গে আবার দেখা হলে তাকে দেখে বেশ খুশি হন তিনি। সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্কও বদলে যায়। একসময় যে সম্পর্কে ছিল ভালোবাসা, অভিমান আর গভীর টানাপোড়েন, পরবর্তীতে সেই সম্পর্কই বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। করিন হফম্যানের জীবনকাহিনি তাই শুধু একটি অসম প্রেমের গল্প নয়। গল্পটি মনে করিয়ে দেয় প্রেমে পড়া হয়তো হৃদয়ের এক স্নিগ্ধ অনুভূতি, ভালোবাসা একটি সম্পর্কের শুরু হতে পারে, কিন্তু শুধু ভালোবাসা থাকলেই যে সেই সম্পর্ক সারাজীবন টিকে থাকবে তার নিশ্চয়তা নেই।