বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দুই দেশের ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে এফটিএ স্বাক্ষর হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেছেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মানজুরুল করিম খান চৌধুরী।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) কুয়ালালামপুরে ‘বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া বিজনেস ফোরাম: ব্যবসায়িক যোগাযোগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সফর উপলক্ষে ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন এসএমই করপোরেশন মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান ট্যাং চ্যাং খিম।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতারও বড় সুযোগ রয়েছে। ক্ল্যাং চাইনিজ চেম্বারের সভাপতি জেফরি তান বলেন, উন্নত লজিস্টিক সুবিধার কারণে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা মালয়েশিয়া, বিশেষ করে ক্ল্যাংয়ে বিনিয়োগের সুযোগ বিবেচনা করতে পারেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারাও সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বেসরকারি খাতকে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বাংলাদেশের জ্বালানি অবকাঠামো, ডিজিটাল অর্থনৈতিক সেবা, টেলিযোগাযোগ, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল খাদ্যপণ্য, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান জানান। পাশাপাশি আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চান তিনি।

স্বাস্থ্য খাতেও বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে তাসকীন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশিরা প্রতিবছর চিকিৎসাসেবার জন্য বিদেশে প্রায় ৪ থেকে ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেন। তাই মালয়েশিয়ার উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিশ্বমানের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। একই সঙ্গে পর্যটন ও হালাল শিল্পের বিকাশেও সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

হাইকমিশনার মানজুরুল করিম খান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ শুধু জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেই নয়, বিনিয়োগের জন্যও সম্ভাবনাময়। দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে অন্যতম বাধা হলো প্রয়োজনীয় বাণিজ্য চুক্তির অনুপস্থিতি। সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরকালে এফটিএ নিয়ে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এফটিএ স্বাক্ষর হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি এভিয়েশন, মেডিক্যাল, তথ্যপ্রযুক্তি ও অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশে হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা এবং সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা চান।

এসএমই করপোরেশন মালয়েশিয়ার চেয়ারম্যান ট্যাং চ্যাং খিম জানান, দেশটিতে বর্তমানে ১৩ লাখ এসএমই রয়েছে। দুই দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও ব্যবসায়িক সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা চেম্বার ও ক্ল্যাং চেম্বারকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি কর্মীরা দেশটির অর্থনীতি, বিশেষ করে অবকাঠামো খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

আলোচনায় বাংলাদেশের ব্যবসা ও বিনিয়োগ সম্ভাবনা নিয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন ঢাকা চেম্বারের ঊর্ধ্বতন সহ-সভাপতি রাজিব এইচ. চৌধুরী। পরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বাড়াতে ঢাকা চেম্বার ও ক্ল্যাং চেম্বারের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ ছাড়া দুই চেম্বারের প্রতিনিধিদের মধ্যে ৪০টি বিটুবি ম্যাচ-মেকিং সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পরে মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতিমন্ত্রী টিয়োং কিং সিংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তাসকীন আহমেদ। সাক্ষাতে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় পর্যটক বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরে মুসলিম পর্যটন খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন টিয়োং কিং সিং। বাংলাদেশে মুসলিম পর্যটন ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে দক্ষ জনবল ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আগ্রহের কথাও জানান তিনি।

এ সময় বাংলাদেশে বিশ্বমানের হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি মালয়েশিয়া সরকার বিবেচনা করছে বলেও জানান টিয়োং কিং সিং। পাশাপাশি দুই দেশের পর্যটন সহযোগিতা বাড়াতে ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টার (আইটিসি) মালয়েশিয়া ও ঢাকা চেম্বারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তাব দেন তিনি।