বর্ষার জলে যখন বিল-ঝিল আর নিচু জমি ছেয়ে যায় শাপলার লাল-সাদা ফুলে, তখন বদলে যায় শরীয়তপুরের প্রান্তিক মানুষের জীবনের ছবিটাও। প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ সেই শাপলাই এখন অনেক নিম্নআয়ের মানুষের কাছে হয়ে উঠেছে বাড়তি আয়ের অবলম্বন। ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে জলাশয়ে নামেন তারা, আর দিনের শুরুটা হয় শাপলা সংগ্রহের মধ্য দিয়ে।
শাপলা সংগ্রহের এই দৃশ্য এখন শরীয়তপুরের বিভিন্ন বিল, ডোবা ও জলাশয়ের চেনা চিত্র। পানি থেকে শাপলা তুলে এনে পরিষ্কার করে ছোট ছোট আঁটি বা মুঠি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাট-বাজারে। সেখানে অন্য সবজির সঙ্গে জায়গা করে নিয়েছে শাপলাও। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে আশপাশের জেলার বাজারেও। ফলে একে ঘিরে গড়ে উঠছে ছোট পরিসরের একটি সরবরাহব্যবস্থা।
আর এই বাজারে শাপলার দামও নির্ভর করে মৌসুম, সরবরাহ ও চাহিদার ওপর। সাধারণত ১০ থেকে ১২টি শাপলা মিলে তৈরি হয় একটি মুঠি, যা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০ থেকে ২০ টাকায়। কোনো পুঁজি ছাড়াই জলাশয় থেকে সংগ্রহ করা যায় বলে জমিহীন ও স্বল্প আয়ের মানুষের কাছে কাজটি বেশ আকর্ষণীয়। বিশেষ করে বর্ষায় কৃষিকাজের সুযোগ কমে গেলে শাপলা হয়ে ওঠে অনেক পরিবারের আয়ের বিকল্প পথ।
শুধু বিক্রিই নয়, শরীয়তপুরের মানুষের খাবারের তালিকাতেও শাপলার রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিচিতি। শাপলা ভাজি, ডাল কিংবা বিভিন্ন মাছের সঙ্গে রান্না - সবই গ্রামবাংলার স্বাদে আলাদা মাত্রা যোগ করে। ইলিশের সঙ্গে শাপলার রান্নাও এ অঞ্চলে বেশ জনপ্রিয়। তাই একই সঙ্গে খাদ্য ও জীবিকার চাহিদা থাকায় বর্ষা মৌসুমে শাপলাকে ঘিরে বাড়ে মানুষের ব্যস্ততা।
তবে শাপলা সংগ্রহ করে যারা জীবিকা চালান, তাদের পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। বেশিরভাগ সংগ্রহকারী কোনো সংগঠিত বাজারব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত নন। স্থানীয় আড়তদার, পাইকার কিংবা খুচরা বিক্রেতার কাছে সরাসরি বিক্রি করতে হয় তাদের। সংরক্ষণ ও পরিবহনের সুযোগ সীমিত হওয়ায় দ্রুত পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন অনেকেই। ফলে বাজারে শাপলার ভালো চাহিদা থাকলেও প্রকৃত সংগ্রহকারীরা সবসময় ন্যায্য দাম পান না।
এই পরিস্থিতিতে শাপলাকে ঘিরে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। সংগ্রহকারীদের সংগঠিত করে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, সরাসরি বাজারসংযোগ তৈরি এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরিষ্কার ও পরিবহনের সুযোগ করা গেলে বাড়তে পারে তাদের আয়। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে শাপলা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এর পাশাপাশি জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
বর্তমানে শরীয়তপুরে শাপলা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কৃষিপণ্য হিসেবে তালিকাভুক্ত নয় বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে জেলার বিল, ডোবা, জলাশয় ও নিচু জমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শাপলা সংগ্রহ করে জীবিকা চালাচ্ছেন বহু মানুষ। পালং বাজারের বিক্রেতা আব্দুল গফুর জানান, প্রতিদিন বিল থেকে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করেই সংসারের খরচ মেটান তিনি। কৃষি বিভাগের উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা মাসুমা জান্নাতও বলছেন, আগের তুলনায় শাপলা এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসছে। অর্থাৎ, জলাভূমির এই স্বাভাবিক ফসলকে ঘিরে সম্ভাবনার দরজাটা খুলছে ধীরে ধীরে - যা পরিকল্পিত উদ্যোগ পেলে হয়ে উঠতে পারে প্রান্তিক মানুষের আরও শক্তিশালী জীবিকার মাধ্যম।