বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের পুরোনো দুর্নীতি মামলা, সম্পদের পরিমাণ ও এর উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।

শুক্রবার (২ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে নিজের ভারিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি সালাহউদ্দিন আহমদের সম্পদের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানান। হাসনাত আবদুল্লাহর ফেসবুক পোস্টটি  সি নেটওয়ার্কস পাঠকদের জন্য হুবহু তুলে ধরা হলো।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে ১ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর আকতার হোসেন লিমিটেড’-এর মালিক মীর জহির হোসেনের কাছ থেকে ১ কোটি টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৭ সালের মে মাসে ধানমন্ডি থানায় এই মামলাটি দায়ের করেছিল।

৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১ কোটি টাকা জরিমানাও করা হয়েছিল। জরিমানার টাকা অনাদায়ে আরও ১ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ঘুষের ১ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার আদেশও দেওয়া হয়েছিল।

২০০৮ সালে তাঁর বিরুদ্ধে আরেকটি দুর্নীতি মামলায় ১৩ বছরের সাজা হয়েছিল। অবৈধভাবে ৪ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে। ১০ বছরের ও ৩ বছরের সাজা মিলিয়ে ১৩ বছর হয়েছিল।

এছাড়াও, চকরিয়ায় মাছের ঘের দখলের দুটি মামলাও ছিল সালাহউদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে। বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে ২০০৭ সালে মামলাটি করা হয়েছিল। এই দুই মামলা থেকেও সালাহউদ্দিন সাহেব অন্তর্বর্তী সরকারের খালাস পান। এ রা‌য়ের পর তিনি দাবি করেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

বিএনপির আজ‌কের এমন অ‌নেক মন্ত্রীই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দুর্নীতির মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। তারা দুদকের মামলাকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা বলে দাবি করেন।

এখন বিএনপির সময়ে দুদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হচ্ছে। সেটির অংশ হিসেবে বিএফইউআইয়ের মাধ্যমে সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংকের হিসাব চাওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র যে কারো ব্যাংক হিসাব চাইতেই পারে। কিন্তু বিষয়টি তখন উদ্বেগজনক হয়, যখন সরকারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললে ব্যাংক হিসাব তলব করা হচ্ছে। যদি রাষ্ট্রীয় কল্যাণের জন্যই ব্যাংক হিসাব তলব করা হয়, তাহলে প্রত্যেক এমপি-মন্ত্রীর ব্যাংক হিসাবও তলব করা হোক।

প্রায় ২০ বছর আগে সালাউদ্দিন আহমেদ গুলশানের অন্যতম দামি ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স ‘প্লাটিনাম রেসিডেন্স’-এ একটি বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টের মালিক হয়েছেন। গুলশানে তাঁর একাধিক বাড়ি ও সম্পদ রয়েছে বলেও আলোচনা রয়েছে।

সাজার কার‌ণে সালাহউদ্দিন আহমদ ২০০৮ সা‌লে নির্বাচনে অংশ নি‌তে পা‌রে‌ননি। উনার স্ত্রী হা‌সিনা আহমদ অংশ নেন। নির্বাচনী হলফনামা অনুসারে, ২০০৮ এ সালাহউদ্দিন-হাসিনা দম্পতির মোট সম্পদ ছিলো ৬.৩ কোটি। ২০১৮ তে ১২.৭ কোটি এবং ২০২৫ এ ৩০ কোটি।

এত সম্পদের উৎস কী? সালাহউদ্দিন আহমদ
‘৮৫ বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। সরকা‌রি চাক‌রিজী‌বি হওয়ায়, ১৯৯৬ সা‌লে রাজনী‌তি‌তে যোগ দেওয়ার আগে ব‌্যবসা করার সু‌যোগ তাঁর ছিল না । ১৯৯৬ সা‌লে সি‌নিয়র সহকারী স‌চিব পদ থে‌কে যখন তি‌নি চাক‌রি থে‌কে ইস্তফা দেন তখন মা‌সে বেতন ভাতা মি‌লি‌য়ে বড়জোর ৬ হাজার টাকা পে‌তেন। মূল‌্যস্ফী‌তি হিসা‌বে যা বর্তমান বাজা‌রের ৪০ হাজার টাকার চে‌য়েও কম সমান। আজ থে‌কে ২০ বছর আগেও গুলশা‌নে ফ্ল‌্যা‌টের দাম‌ ছিল কমপ‌ক্ষে সা‌ড়ে ৩ হাজার টাকা বর্গফুট। ৩ হাজার বর্গফুট ফ্ল‌্যাটের দাম ছিল ওই সম‌য়েই কো‌টি ট‌াক‌া। ৬ হাজ‌ার টাক‌া বেত‌নের সরকা‌রি কর্মকর্তা কী কো‌টি টাকার ফ্ল‌্যাট কিন‌তে পা‌রেন?

২০০১ সা‌লে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী প‌দে থাকায় ব‌্যবসা করার অ‌ধিকার সালাহউদ্দিন আহম‌দের ছিল না। প‌রের দুই বছর কারাগা‌রের ছিলেন। এরপর বিএন‌পি ছিল বি‌রোধী দ‌লে। ১৯৯৬ থে‌কে ২০০১ সাল পর্যন্ত ‌বিএন‌পি ছিল বি‌রোধী দ‌লে। চাক‌রি থে‌কে রাজনী‌তি‌তে এসে সেই সম‌য়ে সংসদ সদস‌্য হ‌ওয়া সালাহউদ্দিন, এই সম‌য়ে কী ব‌্যবসা কর‌লেন যে, প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পরের ক‌য়েক বছ‌রে গুলশা‌নে সম্প‌দের মা‌লিক হ‌য়ে গে‌লেন!

শুধু দেশেই নয়, তাঁর সন্তানদেরও পশ্চিমা উন্নত দেশগুলোতে পড়াশোনা করিয়েছেন বলে জানা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে, সেই অর্থের উৎস কী ছিল?

এই সম্পদের কতটা আয়, কতটা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, কতটা বিনিয়োগ বা অন্য কোনো উৎস থেকে এসেছে—তার কি স্বচ্ছ ব্যাখ্যা রয়েছে? আর সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য এত বিপুল অর্থ কীভাবে বৈধভাবে বিদেশে পাঠানো হয়েছে?

একজন সরকারি কর্মকর্তা থেকে এমপি ও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তাঁর ঘোষিত আয়, সম্পদ বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য আছে কি না—সেটিও জনস্বার্থে খতিয়ে দেখা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: এই বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস কী, এবং তার পক্ষে কি স্বচ্ছ ও যাচাইযোগ্য হিসাব রয়েছে? সুতরাং স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত এমপি-মন্ত্রীদের নিকটাত্মীয় ও আত্মীয়স্বজনদের ব্যাংক হিসাবও প্রতি বছর রাষ্ট্রীয় স্বার্থে তলব করা হোক। আমাকে দি‌য়ে তা শুরু হোক। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দায়িত্ব গ্রহনের আগে ও পরের সম্পদের হিসাব তারা নিজেরাই প্রকাশ করে গেছেন।

দেখি, সরকারি এসব প্রতিষ্ঠান সেই সৎ সাহস দেখাতে পারে কি না!