গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়ার চাপ আগে থেকেই সামলাতে হচ্ছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্পকে। এর মধ্যেই নতুন করে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। ফলে উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা ও পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে নতুন দাম ঘোষণা করা হয়, যা ওইদিন রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে। এর আগে ডিজেল ১১৫, কেরোসিন ১৩৫, অকটেন ১৪৫ এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা লিটারে বিক্রি হচ্ছিল।

২০২৪ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় দেশে জ্বালানি তেলের দাম পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারের তেলের দাম, আমদানি ব্যয়, কর-শুল্ক ও বিনিময় হারসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়। এর আগে এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল।

জ্বালানি তেলের নতুন মূল্যবৃদ্ধির সময় তৈরি পোশাক খাতও নানা সংকটে রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়ায় ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কম। তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে পোশাক রপ্তানিতে ৫ দশমিক ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জুলাই-আগস্টে পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৭ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির মধ্যেও বাড়তি জ্বালানি ব্যয় নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ায় একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয়ও বাড়বে। এর প্রভাব আমদানি ও রপ্তানি—দুই ক্ষেত্রেই পড়তে পারে। পাশাপাশি জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ও মজুরি ব্যয়ের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে বাড়তি উৎপাদন ব্যয় আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সহজ নয়। ব্যবসায়ীদের মতে, উৎপাদন খরচ বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত বাড়তি দাম দিতে আগ্রহী নন। বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা পণ্যের দাম কমানোর চেষ্টা করেন। ফলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ উদ্যোক্তাদের মুনাফা থেকেই বহন করতে হতে পারে।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, লিড টাইম কমানো এবং পণ্যে মূল্য সংযোজনের দিকে নজর দিতে হবে। তার মতে, যেসব ক্ষেত্রে দেশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, সেখানে ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

পোশাক কারখানা বন্ধের পরিসংখ্যানও খাতটির চাপের চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪০২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা ২৮২টি এবং বিকেএমইএর সদস্য কারখানা ১২০টি। বৈশ্বিক চাহিদা, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটসহ বিভিন্ন কারণকে এর পেছনে দায়ী করা হয়েছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরে পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৪ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের অর্জনের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে উৎপাদন সক্ষমতা সচল রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ঠিক এই সময় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সেই চ্যালেঞ্জ আরও বাড়ল।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মনোয়ার মোস্তফার মতে, ডিজেলের দাম বাড়ায় ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহারকারী শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর প্রভাব রপ্তানিমুখী পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপরও পড়তে পারে। ফলে পোশাকশিল্পের জন্য এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলে রপ্তানির বর্তমান প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা এবং নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছানো কতটা সম্ভব হবে।