‘নদ’ নাম শুনতেই আপনার কল্পনায় কী ভেসে ওঠে? সবার মতো আপনার চোখের সামনেও হয়তো ভেসে ওঠে সেই বিস্ময়কর ইতিহাসের কথা—যেখানে ফেরাউনের হাত থেকে বাঁচাতে মুসা আলাইহিস সালামের মা তাঁকে একটি ঝুড়িতে রেখে নীলনদে ভাসিয়ে দেন। আর সেই নদী তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ফেরাউনের প্রাসাদের কাছে, যেখানে ফেরাউনের স্ত্রী তাঁকে দত্তক নেন। কিংবা মনে পড়ে যায় মিশরের হাজার বছরের ইতিহাস, সভ্যতা, রহস্য আর ধর্মীয় কাহিনি।

হাজার বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে আজও বয়ে চলেছে নীলনদ। কিন্তু কোথা থেকে এই নদীর উৎপত্তি? আর কেনই বা প্রাচীন মিশরের সভ্যতা গড়ে উঠেছিল এই নদীকে ঘিরে? কীভাবে নীলনদ হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের জীবন, কৃষি ও সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে? চলুন জেনে নেওয়া যাক উত্তর।

নীলনদকে ঘিরে রহস্যের যেন কমতি নেই। এর অন্যতম প্রধান ও অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো—এটি দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়েছে। যেখানে পৃথিবীর বেশিরভাগ নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত হয়। নীলনদের দুটি প্রধান উৎস রয়েছে। একটি উগান্ডা, কেনিয়া ও তানজানিয়ার সীমান্তবর্তী ভিক্টোরিয়া হ্রদ, যেখান থেকে উৎপত্তি হয়েছে শ্বেত নীলের। অন্যটি ইথিওপিয়ার তানা হ্রদ থেকে আসা নীল নীল। এই দুটি শাখা সুদানের রাজধানী খার্তুমের কাছে এসে একত্রিত হয়ে মূল নীলনদ গঠন করে। এরপর নদটি উত্তর দিকে প্রবাহিত হয়ে ভূমধ্যসাগরে গিয়ে পড়েছে। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস যেন যথার্থই বলেছিলেন, ‘মিশর হলো নীলনদের দান।’ কারণ চারদিকে মরুভূমিবেষ্টিত এই অঞ্চলে নীলনদ না থাকলে আজকের বিখ্যাত মিশরীয় সভ্যতার কোনো অস্তিত্বই হয়তো পৃথিবীতে থাকত না।

প্রাচীন মিশরীয়দের জীবনযাত্রা, সমাজ ও সংস্কৃতি পুরোপুরি গড়ে উঠেছিল এই নদকে কেন্দ্র করে। সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সাহারা মরুভূমির মতো উষর ও শুষ্ক অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে গেলেও নীলনদের জলপ্রবাহ কখনো থেমে যায়নি। সেই শুরু থেকে আজও মিশরের ধু-ধু মরুভূমির বুক চিরে অবিরাম বয়ে চলেছে এই নদ। তাই নীলনদকে বলা হয় সভ্যতার আঁতুড়ঘর। এ ছাড়া মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, দেবতারা নীলনদ নিয়ন্ত্রণ করেন। তাদের জীবন ও মৃত্যুর ধারণাও ছিল নদীকেন্দ্রিক। নদীর পূর্ব পাড়ে সূর্য উদিত হতো বলে তারা একে ‘জীবনের প্রতীক’ মনে করত এবং পূর্ব পাড়েই শহর গড়ে তুলত। অন্যদিকে, পশ্চিম পাড়ে সূর্য অস্ত যেত। তাই পিরামিড, রাজাদের সমাধি এবং মমিগুলো নদীর পশ্চিম পাড়ের মরুভূমিতে স্থাপন করা হতো।