৪৮ বছর ধরে যে গাণিতিক সমস্যা গবেষকদের ভাবিয়েছে, এবার সেই জটিলতার দেয়াল ভাঙার দাবি করেছে কোয়ান্টাম কম্পিউটার। চীনের ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি ও সিংহুয়া ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক বলছেন, কোয়ান্টাম প্রযুক্তির সাহায্যে সফলভাবে প্রমাণ করা হয়েছে দুটি কঠিন গাণিতিক উপপাদ্য। ফলে গণনার জগতে এটি শুধু নতুন একটি ফলাফল নয়, বরং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সম্ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
আর এই সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে ১২১ কিউবিটের একটি সুপারকন্ডাক্টিং কোয়ান্টাম প্রসেসর। সাধারণ কম্পিউটারের তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক বিট, যেখানে থাকে ০ অথবা ১, আর কোয়ান্টাম কম্পিউটার কাজ করে কিউবিট নিয়ে। কিউবিটের বিশেষ বৈশিষ্ট্য কাজে লাগিয়ে জটিল গণনা ও সম্ভাব্য সমাধানের অনুসন্ধান নতুন মাত্রা পেতে পারে। সেই প্রযুক্তিকেই এবার কাজে লাগানো হয়েছে সরাসরি গাণিতিক যুক্তি ও উপপাদ্য প্রমাণের কাজে।
তবে বিষয়টি এমন নয় যে, কোয়ান্টাম কম্পিউটার সাধারণ কম্পিউটারের চেয়ে দ্রুত উত্তর বের করেছে। বরং সাফল্যের আসল জায়গাটি আরও গভীরে। গবেষকদের দাবি, কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারের ওপর সরাসরি জটিল যৌক্তিক নিষ্কাশনের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অর্থাৎ শুধু প্রচলিত কম্পিউটারের মতো হিসাব নয়, বরং একটি গাণিতিক বক্তব্য সত্য - এটি যুক্তির মাধ্যমে প্রমাণ করার প্রক্রিয়াতেও কোয়ান্টাম প্রসেসরকে ব্যবহার করা হয়েছে।
এই পরীক্ষায় প্রথম যে উপপাদ্যটি প্রমাণ করা হয়েছে, সেটি ছিল বর্গক্ষেত্রের কর্ণদ্বয়ের লম্ব অবস্থান সম্পর্কিত একটি জ্যামিতিক সমস্যা। গবেষক নিয়াং ওয়াংয়ের তথ্যমতে, এ সমস্যার সমাধানে উ মেথডের একটি হাইব্রিড রূপ ব্যবহার করা হয়। সেই পদ্ধতির মাধ্যমে কোয়ান্টাম কম্পিউটার স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োজনীয় যুক্তিগুলো অনুসরণ করে উপপাদ্যটি প্রমাণ করতে সক্ষম হয়।
প্রথম পরীক্ষার পর গবেষকদের সামনে আসে আরও জটিল এক ধাঁধা। দ্বিতীয় উপপাদ্যটি ছিল পরস্পরছেদী ত্রিভুজ ও বৃত্তকে ঘিরে তৈরি একটি জটিল জ্যামিতিক সমস্যা। এবার শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে না গিয়ে গবেষকেরা ব্যবহার করেন প্রতীকী প্রমাণ অনুসন্ধান নামের বিশেষ কৌশল। আর সেই পদ্ধতির মাধ্যমেই কোয়ান্টাম প্রসেসর জটিল জ্যামিতিক সম্পর্কগুলো বিশ্লেষণ করে প্রমাণের পথ খুঁজে নেয়।
ফলে ৪৮ বছর পুরোনো এই গাণিতিক সমস্যার সমাধানের দাবি শুধু একটি পুরোনো অঙ্কের উত্তর খোঁজার গল্প নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের কম্পিউটিংয়ের বড় সম্ভাবনা। কারণ, স্বয়ংক্রিয় যুক্তি ও গাণিতিক প্রমাণের মতো জটিল কাজে কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যারকে ব্যবহার করা গেলে গবেষণা, গণিত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত পদ্ধতির পথ খুলতে পারে।
আর এখানেই এই গবেষণার সবচেয়ে বড় তাৎপর্য - কোয়ান্টাম কম্পিউটার শুধু দ্রুত গণনার যন্ত্র নয়, বরং জটিল যুক্তি অনুসরণ করে সমস্যা সমাধানের নতুন মাধ্যম হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ১২১ কিউবিটের একটি প্রসেসরে দুটি কঠিন উপপাদ্যের প্রমাণ দেখিয়ে গবেষকেরা সেই সম্ভাবনারই একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেছেন। এখন দেখার বিষয়, এই পথ ধরে ভবিষ্যতে আরও কত কঠিন গাণিতিক ধাঁধার জট খুলতে পারে কোয়ান্টাম প্রযুক্তি।