১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল অ্যাডলফ হিটলার মারা যান—ইতিহাসের প্রচলিত বর্ণনা এমনই। তবে তাঁকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার নানা তত্ত্বও রয়েছে। বাস্তব জগতে কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, সাধারণত তার একটি নির্দিষ্ট উত্তর থাকে। কিন্তু কোয়ান্টাম জগতে গিয়ে সেই পরিচিত ধারণাই জটিল হয়ে ওঠে।
কোয়ান্টাম বলবিদ্যার অন্যতম পরিচিত উদাহরণ শ্রোডিঙ্গারের বিড়াল। একটি কাল্পনিক বাক্সে থাকা বিড়ালকে এমন একটি কোয়ান্টাম ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যার ফলাফল পর্যবেক্ষণের আগে দুটি সম্ভাবনাই বহাল থাকে। শ্রোডিঙ্গারের এই চিন্তাপ্রয়োগ বোঝায়, কোয়ান্টাম জগতের সম্ভাব্যতা আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার ধারণার সঙ্গে কতটা ভিন্ন।
ক্ষুদ্র কণার ক্ষেত্রে কোনো কণার অবস্থান বা আচরণ অনেক সময় নির্দিষ্ট একটি ফলাফলের বদলে সম্ভাব্যতার মাধ্যমে বর্ণনা করতে হয়। যেমন, কোনো ইলেকট্রনকে নির্দিষ্টভাবে কোথায় পাওয়া যাবে, তা পরিমাপের আগে সম্ভাব্যতার বণ্টন দিয়ে প্রকাশ করা হয়।
এখানেই আসে পর্যবেক্ষণ বা পরিমাপের বিষয়টি। কোয়ান্টাম মেকানিকসে একটি পরিমাপ করলে সম্ভাব্য কয়েকটি ফলাফলের মধ্য থেকে একটি নির্দিষ্ট ফল পাওয়া যায়। তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের দেখা বা চেতনা সরাসরি বাস্তবতা তৈরি করে। বরং পরিমাপের মাধ্যমে কোয়ান্টাম ব্যবস্থার সঙ্গে এমন মিথস্ক্রিয়া ঘটে, যার ফলে নির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া যায়।
আলোর দ্বৈত প্রকৃতি বোঝাতে ১৮০১ সালে টমাস ইয়ংয়ের দ্বি-চিড় পরীক্ষার কথা বলা হয়। দুটি সরু চিড়ের মধ্য দিয়ে আলো পাঠালে পর্দায় হস্তক্ষেপের ডোরাকাটা নকশা তৈরি হয়, যা আলোর তরঙ্গধর্ম প্রকাশ করে। আবার আলোককণাকে এককভাবে শনাক্ত করলে তার কণাধর্মও স্পষ্ট হয়।
পরে পদার্থবিদ জন আর্চিবাল্ড হুইলার এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে ‘ডিলেড-চয়েস’ বা বিলম্বিত নির্বাচন পরীক্ষার প্রস্তাব দেন। এখানে ফোটন চিড় অতিক্রম করার পরও পরীক্ষার পদ্ধতি নির্ধারণ করা যায়—ফলে পর্যবেক্ষণের ধরন অনুযায়ী পরীক্ষায় তরঙ্গ বা কণার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
এই ফলাফলকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয় যে, বর্তমানের সিদ্ধান্ত অতীতকে বদলে দিয়েছে। তবে পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বিষয়টি এত সরল নয়। পরীক্ষাটি অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা পরিবর্তন করে না; বরং কোয়ান্টাম ব্যবস্থাকে কীভাবে পরিমাপ করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে কোন ধরনের ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা যাবে।
এ ধরনের পরীক্ষার সঙ্গে ‘কোয়ান্টাম ইরেজার’ নিয়েও আলোচনা হয়। এসব পরীক্ষায় কোন পথে কণা গিয়েছিল—এমন তথ্য সংরক্ষিত বা মুছে ফেলার সঙ্গে হস্তক্ষেপের ধরন বদলে যেতে পারে। ফলে কোয়ান্টাম জগতে ‘অতীত নির্ধারিত নয়’—এমন ধারণা নিয়ে নানা দার্শনিক ব্যাখ্যা তৈরি হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অতীত ঘটনাগুলো বর্তমানে বসে পরিবর্তন করা সম্ভব। বড় জগতের বস্তু ও ঘটনাগুলো কোয়ান্টাম স্তরের মতো একইভাবে আচরণ করে না।
কোয়ান্টাম মেকানিকস বরং আমাদের দেখায়, অতিক্ষুদ্র জগতে বাস্তবতা সম্পর্কে প্রচলিত ‘হয়েছে বা হয়নি’, ‘কণা বা তরঙ্গ’—এমন সরল দ্বৈত ধারণা সবসময় যথেষ্ট নয়। পর্যবেক্ষণ, পরিমাপ এবং সম্ভাব্যতার সম্পর্কই সেখানে বাস্তবতাকে বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি।