কুমিল্লাজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে কিশোর গ্যাংয়ের নৈরাজ্য ও বেপরোয়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। প্রকাশ্য দিবালোকে রামদা ও চাপাতি নিয়ে অস্ত্রের মহড়া, টিকটকের আড়ালে সদস্য সংগ্রহ, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় খুনাখুনির মতো ঘটনায় আতঙ্কিত শহরবাসী।
সম্প্রতি ১৩ বছরের কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নির্জন পাহাড়ি জঙ্গলে নিয়ে আইফোন ছিনতাই ও নৃশংসভাবে হত্যার পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ভয়াল চিত্রটি আবারও নতুন করে সামনে এসেছে।
প্রকাশ্যে রামদা-চাপাতির মহড়া ও শহরের পরিস্থিতি গত মে মাসের এক বিকেলে কুমিল্লার কাপ্তানবাজার, বৌবাজার, চানপুর ও সংরাইশ এলাকায় ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে ১০০ থেকে ১৫০ জন কিশোর-তরুণ প্রকাশ্যে রামদা, চাপাতি ও লাঠি নিয়ে মহড়া দেয়। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার জানান, এই গ্যাংটির নাম ‘ক্রাইম সেটআপ’।
অনুরূপভাবে ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও এপ্রিলে রানীর দিঘির পাড়, কান্দিরপাড়, তালপুকুরপাড় এবং আদালতপাড়ায় একাধিকবার দেশীয় অস্ত্র ও বাজি ফুটিয়ে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়।
বর্তমানে ২৫টি অপরাধে অন্তত ২০টি সক্রিয় গ্যাং অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে কুমিল্লা শহরে অন্তত ২০টি কিশোর গ্যাং এবং একাধিক উপ-গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধে এদের নাম এসেছে। সবচেয়ে আলোচিত ৫টি গ্রুপ হলো—‘কিং স্কোয়াড’, ‘স্কোয়াড বা রতন গ্রুপ’, ‘ইগল’, ‘সিবিকে’ এবং ‘ক্রাইম সেটআপ’। এ ছাড়া অপু ও সাব্বিরের নেতৃত্বাধীন উপ-গ্রুপও সক্রিয় রয়েছে।
পুলিশের নথিপত্র অনুসারে, ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অন্তত ১২টি হত্যার ঘটনা এবং শতাধিক অপরাধের সঙ্গে এসব কিশোর গ্যাং জড়িত। এর আগে ২০২২ সালে ‘রতন’ ও ‘ইগল’ গ্রুপের বিরোধে রবিউল হাসান শাহাদাত নামে এক কিশোর খুন হয়। এছাড়া ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে অশোকতলায় মাদক কারবার সংক্রান্ত বিরোধে সজীব নামে এক তরুণকে হত্যা করা হয়।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড ও 'অসম বন্ধুত্ব' কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম হত্যায় অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিন একটি গ্যাং তৈরির চেষ্টা করছিলেন। মূলত টিকটক ভিডিও ধারণ, দামি আইফোন ও বাইকের প্রতি আকর্ষণ এবং 'গ্যাং পার্টির' মাধ্যমে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের এই অপরাধ জগতে টানা হচ্ছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অপ্রতিমের মা সহকারী প্রক্টর থাকাকালে মাদকবিরোধী অভিযানে গ্যাং সদস্যদের পুলিশে সোপর্দ করেছিলেন—সেই ক্ষোভ থেকেও এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনের বক্তব্য কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা (টিপু) জানান, বর্তমানে কুমিল্লার প্রায় প্রতিটি পাড়া-মহল্লাতেই কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্ব রয়েছে। বিগত দিনে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা এদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আড়াইশর বেশি কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বয়স কম হওয়ায় তারা আইনের ফাঁক গলে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়াচ্ছে। সিএইচপি সভাপতি অধ্যাপক নিখিল চন্দ্র রায় সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি এবং প্রশাসনিক কঠোরতার ওপর জোর দিয়েছেন।