মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধে অংশ নেওয়া মার্কিন নৌবাহিনীর পরাক্রমশালী বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’-এর অন্তত আটজন সেনাসদস্য দায়িত্ব পালনকালে আত্মহত্যা করার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। সাবেক মার্কিন ভারপ্রাপ্ত নৌ সচিব হাং কাও সিনেটে পাঠানো একটি বিশেষ চিঠি মারফত মার্কিন সামরিক বাহিনীর এই চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছেন।

মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম সিএনএনের (CNN) হাতে আসা সরকারি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘমেয়াদি উচ্চমাত্রার এই যুদ্ধ অভিযানে দায়িত্ব পালনকালে ওই রণতরীর সেনাসদস্যদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা চরম আকার ধারণ করেছিল। তবে উদ্ধার তৎপরতার কারণে শেষ পর্যন্ত কোনো সেনাসদস্যের প্রাণহানি বা মৃত্যু ঘটেনি বলে চিঠিটিতে স্পষ্ট করা হয়েছে।

প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, উক্ত রণতরী বহরে আনুমানিক ছয় থেকে সাত হাজার মার্কিন সেনা নিয়োজিত ছিলেন। টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো প্রকার বন্দরে নোঙর বা বিশ্রামের সুযোগ ছাড়া সমুদ্রের বুকে একটানা যুদ্ধ অভিযান পরিচালনা করার কারণে সেনাসদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক মানসিক চাপ চরম সীমায় পৌঁছেছিল।

মার্কিন সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ডের এক প্রশ্নের জবাবে ভারপ্রাপ্ত নৌ সচিব স্বীকার করেন যে, আত্মহত্যার এই চেষ্টা কেবল মূল রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এর সাথে থাকা বহরের এসকর্ট যুদ্ধজাহাজ ও এভিয়েশন স্কোয়াড্রনের সেনাসদস্যদের মধ্যেও এই ভয়াবহ প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছিল।

যুদ্ধকালীন চরম মানসিক অস্থিরতা সহ্য করতে না পেরে একাধিক সেনাসদস্য চলন্ত জাহাজ থেকে সরাসরি সমুদ্রের জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন। তবে অন্যান্য সহকর্মীদের তাৎক্ষণিক তৎপরতায় দ্রুত তাঁদের উদ্ধার করে চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা সিএনএন-কে জানিয়েছেন, সাধারণত বছরে এক বা দুজন সেনার ক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নেওয়ার খবর পাওয়া গেলেও, একই মিশন চলাকালে একসাথে আটজন সেনার আত্মহত্যার চেষ্টা অত্যন্ত ভয়াবহ ও নজিরবিহীন একটি ঘটনা।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্রামহীন জীবনসূচি, প্রতিনিয়ত যুদ্ধের জরুরি রেড অ্যালার্ট এবং দীর্ঘকাল ধরে মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার কারণেই এই মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। শুধু তা-ই নয়, রণতরীটিতে পানীয় জলের তীব্র সংকট এবং ব্যবহার্য গরম জলের অপ্রতুলতার মতো মৌলিক সুবিধার অভাবও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক অবনতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার রিপোর্ট সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সিনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ড সরকারের বর্তমান নীতি ও সামরিক মানসিক স্বাস্থ্য সেবার ব্যর্থতার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, সেনা এবং তাদের পরিবার প্রতিদিন দেশের জন্য যে অপরিসীম ত্যাগ স্বীকার করছে, ট্রাম্প প্রশাসন তাকে 'ভুয়া খবর' বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, দামি অস্ত্র এবং বিলাসবহুল সামরিক প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হলেও, দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা সৈনিকদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যে যে চরম অবহেলা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।