চট্টগ্রামের আনোয়ারায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভুল চিকিৎসা ও অবহেলায় আট বছরের এক শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় শিশুটির মরদেহ নিয়ে হাসপাতালের সামনে প্রায় সাড়ে ১৬ ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ করেছেন স্বজনরা।
নিহত শিশুর নাম মো. আয়ান (৮)। বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে তার মৃত্যুর পর থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টা পর্যন্ত সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ রেখে প্রতিবাদ করেন স্বজনরা। এ সময় হাসপাতালটি তালাবদ্ধ ছিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাউকে সেখানে পাওয়া যায়নি।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে প্রাইভেটকারের ধাক্কায় আহত হয় আয়ান। পরে স্বজনরা তাকে আনোয়ারার বটতলী রুস্তমহাট এলাকার সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।
শিশুটির নানি কুলসুমা বেগম ও মামা সাইফুর রহমানের অভিযোগ, হাসপাতালে কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই কর্মচারীদের মাধ্যমে আয়ানকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে একটি চিকিৎসাপত্র দিয়ে তিন দিন পর হাসপাতালে আসতে বলা হয় এবং শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
তাদের দাবি, বাড়ি নেওয়ার পর রাত ৯টার দিকে আয়ানের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। পথে কাফকো সেন্টার এলাকায় তার মৃত্যু হয়।
এরপর রাত ১০টার দিকে মরদেহ নিয়ে স্বজনরা আবার সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে যান এবং বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীরা সেখান থেকে সরে যান।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অ্যাম্বুলেন্সে আয়ানের মরদেহ নিয়ে বসে আছেন তার নানি ও মামা। হাসপাতালের মূল ফটকে তালা ঝুলছিল।
নানি কুলসুমা বেগম অভিযোগ করে বলেন, কোনো পরীক্ষা ছাড়াই আয়ানকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বারবার শিশুটির গুরুত্ব বুঝিয়ে বললেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি। তাদের অবহেলার কারণেই আয়ানের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান স্বজনরা।
তবে স্বজনদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. মিজানুর রহমান। মোবাইল ফোনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, শিশুটি হাসপাতালে মারা যায়নি। দুর্ঘটনার পর তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল। পরে চমেক হাসপাতালে নেওয়ার পথে অথবা বাড়িতে শিশুটির মৃত্যু হয়।
হাসপাতাল পরিচালক আরও অভিযোগ করেন, শিশুটির মৃত্যুর পর স্বজনরা মরদেহ নিয়ে হাসপাতালে এসে ভাঙচুর ও চিকিৎসক-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করেন। পাশাপাশি তারা ২০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা আতাউল্লাহ নামের এক কর্মী জানান, বুধবার বিকেলে শিশুটিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। পরে তার মৃত্যুর খবর শুনেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানেন না বলে জানান তিনি।
ঘটনাটি তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী জানান, ভুল চিকিৎসায় শিশু মৃত্যুর অভিযোগের ভিত্তিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা. জামশেদ গিয়াস উদ্দিনকে প্রধান করে কমিটি করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন ডা. বিবি জয়নাব ও মো. বেলাল হোসেন।
তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
তিনি আরও জানান, অভিযুক্ত হাসপাতালটি নিবন্ধনের আবেদন করে প্রাথমিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি পেয়েছিল।
এদিকে আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী জানান, শিশু মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। নিহতের স্বজন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।