বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কায় বাংলাদেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে বলে সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা এখন উল্টো দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
৭ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আছে। এতে মানুষের কাজের সুযোগ ও আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের উচ্চ দামের কারণে কমেছে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২২ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছে।
চরম দারিদ্র্যের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দিনে ৩ ডলারের আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা বিবেচনায় ২০২২ সালে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়াতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, গত চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। আয় কিছুটা বাড়লেও ব্যয় বেড়েছে আরও বেশি। ফলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট, যা শিল্প ও ব্যবসা কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান কাজের সময় কমিয়েছে এবং কোনো কোনো কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। এতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও কমেছে। সাম্প্রতিক কর্মসংস্থান সংকটে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
সংস্থাটির ধারণা, শুধু ২০২৬ অর্থবছরেই দেশে দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়েছে। ২০২৫ অর্থবছরের পর নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। তবে ২০২৫ সালের পর শ্রমশক্তি জরিপের নতুন তথ্য না থাকায় কর্মসংস্থানের পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজস্ব ব্যবস্থার দুর্বলতাও দরিদ্র মানুষের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, প্রত্যক্ষ কর ও সরকারি সহায়তা দারিদ্র্য কমাতে ভূমিকা রাখলেও পরোক্ষ করের চাপ সেই সুফল অনেকটাই কমিয়ে দেয়। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো সরকারি সহায়তায় যে সুবিধা পায়, তার তুলনায় কর হিসেবে বেশি অর্থ পরিশোধ করছে।
সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থাতেও রয়েছে বড় ঘাটতি। ২০২৬ সালে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ৯০টি কর্মসূচি পরিচালিত হলেও সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের ৬২ শতাংশই এসব সুবিধার বাইরে রয়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের ১৮ শতাংশ এসব সুবিধা পাচ্ছে।
বিদ্যুৎ ভর্তুকিতেও ধনী-দরিদ্র বৈষম্য রয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাসে সরকারের ভর্তুকি বেড়ে ৮৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবার বিদ্যুৎ ভর্তুকির মাত্র ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ সুবিধা পেয়েছে। বিপরীতে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পেয়েছে ৩৩ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক দাম বেড়েছে, পাশাপাশি বেড়েছে আমদানি ব্যয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের জ্বালানি তেল আমদানির বিল ১০৭ শতাংশ এবং সারের আমদানি ৪২ শতাংশ বেড়েছে।
বিশ্বব্যাংকের মতে, জ্বালানি সংকট দীর্ঘায়িত হলে বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্প খাতের ঘুরে দাঁড়ানো আরও বিলম্বিত হতে পারে। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা ও লক্ষ্য নির্ধারণে দক্ষতা বাড়ানো এবং দরিদ্র মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।