শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। বিশৃঙ্খলা, উসকানি, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানি এবং দুষ্কৃতকারীদের তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে সাভার উপজেলা পরিষদ হলরুমে দুর্গাপূজা-২০২৬ উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা ও সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে আয়োজিত সভায় সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এবং বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন (বাবু)।

ডিসি ফরিদা খানম বলেন, প্রতিমা তৈরির সময় থেকে শুরু করে পূজা উদযাপন ও বিসর্জন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশ, আনসার, সিআরবি/এসআরবি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন তিনি। প্রয়োজনে টহল ও গোয়েন্দা তৎপরতাও বাড়াতে হবে।

গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে আইপি ক্যামেরা স্থাপন এবং ভিডিও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জেবল ক্যামেরা স্থাপন করে সেগুলো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় ও সংশ্লিষ্ট থানার সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র ও বাহুবন্ধনী নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী স্বেচ্ছাসেবকের সংখ্যাও পর্যাপ্ত রাখার নির্দেশ দেন তিনি।

মণ্ডপের অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেন জেলা প্রশাসক। প্রতিটি মণ্ডপে কমপক্ষে ৫ কেজি ধারণক্ষমতার অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পর্যাপ্ত আলো, চার্জার লাইট ও প্রয়োজন অনুযায়ী জেনারেটর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। পূজা শুরুর আগেই ফায়ার সার্ভিস ও বিদ্যুৎ বিভাগের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক ও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শনের কথাও জানান তিনি।

বিসর্জনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্থান ব্যবহারের নির্দেশ দিয়ে ফরিদা খানম বলেন, বিসর্জনস্থলে ফায়ার সার্ভিস, নৌপুলিশ ও ডুবুরি দল প্রস্তুত রাখতে হবে। পাশাপাশি যানবাহন চলাচল, আলোকসজ্জা, পরিচ্ছন্নতা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিসর্জন শেষ করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো ঠেকাতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কোনো তথ্য যাচাই না করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ বা শেয়ার না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে এর উৎস চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধ করা জরুরি। ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা হলে সংশ্লিষ্টদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার নির্দেশও দেন তিনি।

ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ এই চেতনায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতা বজায় রাখতে হবে। আজান ও নামাজের সময় পূজামণ্ডপে মাইক বা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

পূজামণ্ডপ ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া এবং পূজা শেষে দ্রুত বর্জ্য অপসারণের নির্দেশও দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মণ্ডপ ঘিরে মেলা, মাদক, জুয়া, হাউজি বা কোনো ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেন তিনি।

ডিসি জানান, পূজার নিরাপত্তা প্রস্তুতি মহালয়া থেকেই শুরু করতে হবে। আগামী ১০ অক্টোবর সকাল ৫টা থেকে মহালয়া উপলক্ষে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপ বা আশপাশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না করার বিষয়েও নির্দেশনা দেওয়া হয়।

সীমান্তবর্তী এলাকায় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়ে ফরিদা খানম বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম বা অনুপ্রবেশের কোনো সুযোগ দেওয়া যাবে না। সম্ভাব্য কোনো ঝুঁকি বা সমস্যা দেখা দিলে ঘটনা ঘটার অপেক্ষা না করে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোর জন্য পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, দুর্গাপূজার নিরাপত্তা শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজনের নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সামাজিক দায়িত্ববোধও জড়িত। ঢাকা জেলা প্রশাসন শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ পরিবেশে পূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করবে।

সভায় জানানো হয়, এবার সাভার উপজেলায় মোট ২৩৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে সাভার পৌরসভায় ৪৫টি, শিমুলিয়া ইউনিয়নে ৪০টি, ধামসোনায় ১৩টি, আশুলিয়ায় ১১টি, ইয়ারপুরে ১০টি, পাথালিয়ায় ৩০টি, বিরুলিয়ায় ১৪টি, সাভার ইউনিয়নে ৩টি, বনগাঁওয়ে ১২টি, তেতুলঝোড়ায় ২৬টি, কাউন্দিয়ায় ১২টি এবং ভাকুর্তায় ২২টি পূজামণ্ডপ রয়েছে। আমিনবাজার ইউনিয়নে এবার কোনো পূজামণ্ডপ নেই।