যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা নিরসনের লক্ষ্যে কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন এক কূটনৈতিক বার্তা পাঠিয়েছে ইরান। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র নির্দিষ্ট শর্তসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করলে পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি' আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।

নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে অংশ নেওয়ার ফাঁকে কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এসব পরোক্ষ বার্তা আদান-প্রদান করা হয়। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, ওয়াশিংটন প্রস্তাবটি গ্রহণ করা মাত্রই এই সাত দিনের সময়সীমার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে যাবে। তবে যুদ্ধ প্রায় সাত মাসের কাছাকাছি গড়ালেও উভয় পক্ষই কাতারের মধ্যস্থতায় বার্তা আদান-প্রদানকে ‘ইতিবাচক’ বললেও এখনো পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের স্থায়ী শান্তির কূটনৈতিক অগ্রগতির ইঙ্গিত মেলেনি।

ইরানের প্রস্তাবে কী আছে?

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের নির্দিষ্ট পরিকল্পনা হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বিস্তারিত পুরো বিষয়টি না প্রকাশ করলেও তিনি ইঙ্গিত দেন, এটি গত ১৭ জুনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রায় অনুরূপ।

ইরানের শর্ত অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই সময়সীমা গণনায় আসবে। টানা সাত দিন যুদ্ধ পুরোপুরি বন্ধ থাকবে— যার মধ্যে লেবানন ফ্রন্টও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ অবরোধ তুলে নেবে, তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদসমূহ অবমুক্ত করবে। এর ধারাবাহিকতায় সপ্তম দিনের মাথায় হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে এবং পরবর্তীতে দুই পক্ষ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে বসবে।

জুনের সমঝোতার সাথে বৈপরীত্য ও অমিল

গত জুনের চুক্তি অনুযায়ী, ৬০ দিনের জন্য কোনো টোল ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং ওই সময়ের মধ্যে স্থায়ী শান্তি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরে প্রণালিতে পুনরায় জাহাজ চলাচল ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের নতুন বিরোধে সেই চুক্তি ভেস্তে যায়।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন প্রস্তাবে ইরান সময়সীমা ৬০ দিন থেকে কমিয়ে ৭ দিনে এনেছে এবং পর্যায়ক্রমিক শর্তে পরিবর্তন এনেছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক আরবান কনিংহ্যামের মতে, ইরান অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণকে দরকষাকষির প্রধান হাতিয়ার বা ‘রেড লাইন’ হিসেবে ধরে রেখেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন ও মার্কিন অবস্থান

ওয়াশিংটন বর্তমানে গোটা পরিস্থিতির ওপর নিজেদের কঠোর আধিপত্য ধরে রাখতে চাইছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, কাতারি মধ্যস্থতায় বৈঠকগুলো ইতিবাচক হলেও এটাকে বিশাল কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘের ভাষণে কঠোর ভাষায় ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না এবং তারা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের জন্য হয়তো অপেক্ষা করছে।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। তেহরান এই অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটকে কাজে লাগিয়ে চাপ তৈরির কৌশল নিলেও ওয়াশিংটন সব ইস্যু আলাদা করে না দেখে এক প্যাকেজে আলোচনা করতে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে। ফলে সংঘাত বন্ধ ও পরমাণু চুক্তি কতদূর এগোবে, তা এখনো অনিশ্চিত রয়ে গেছে।