আজ থেকে ৩৩ বছর আগে শেষ হয়েছিল নাটকটির প্রচার। অথচ সময় পেরিয়ে গেলেও দর্শকের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত ‘কোথাও কেউ নেই’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই সময়ে নাটকটির বিভিন্ন দৃশ্য, সংলাপ ও চরিত্রের ভিডিও বারবার ছড়িয়ে পড়ে। নতুন প্রজন্মের কাছেও আলোচনায় আসে বাকের ভাইসহ নাটকের জনপ্রিয় চরিত্রগুলো। বিশেষ করে শেষ পর্ব ঘিরে দর্শকদের যে আবেগ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা এখনো স্মরণ করেন অনেকে।
হুমায়ূন আহমেদ তাঁর আত্মজীবনীমূলক একটি বইয়ে লিখেছেন, ‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৯৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর। সেই হিসাবে আজ ৩৩ বছর পূর্ণ হলো নাটকটির শেষ পর্ব প্রচারের। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে এখনো নাটকটির সব পর্ব পাওয়া যায়। সেসব পর্বের নিচে মন্তব্যের ঘরে দর্শকেরা লিখছেন তাঁদের পুরোনো দিনের স্মৃতি ও নাটকটি ঘিরে তৈরি হওয়া আবেগের কথা।
শেষ পর্ব প্রচারের সময়ের স্মৃতি মনে করে মোহাম্মদ ইমরান লিখেছেন, ‘আমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়তাম। আমাদের এলাকার বড় ভাইয়েরা মিছিল দিয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে আমিও মিছিলে ছিলাম। এটা আমার জীবনের অনেক বড় একটি স্মৃতি, যা প্রায়ই মনে পড়ে। নাটকটির শেষ পর্ব দেখে অনেক কেঁদেছিলাম। এখনো যতবার দেখি, নিজের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসে।’
টিটু নামের আরেক দর্শক লিখেছেন, ‘আমার স্পষ্ট মনে আছে, এই নাটকের শেষ পর্ব দেখার জন্য আমাদের টেলিভিশন ঘরের বাইরে বের করতে হয়েছিল। আমাদের উঠান মানুষে ভরে গিয়েছিল। আর মানুষের যে কান্না, সেই অনুভূতি আজকালকার ছেলেমেয়েরা কল্পনাও করতে পারবে না।’
নাটকটির জনপ্রিয়তা নিয়ে দর্শকদের অনেকেই মনে করেন, তখনকার নাটকে সমাজ ও জীবনের নানা বাস্তব চিত্র উঠে আসত। সে কারণে চরিত্রগুলোও দর্শকের কাছে খুব আপন হয়ে উঠত। আনসার আহমেদ লিখেছেন, ‘শৈশবের ওই দিনগুলোয় দেখেছি, এই নাটকটি নিয়ে মানুষের মধ্যে কী এক উন্মাদনা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটাই বোধ হয় একমাত্র নাটক, যেটি ঘিরে “বাকের ভাইয়ের মুক্তি চাই” স্লোগানে মিছিল পর্যন্ত হয়েছিল। বোঝা যায়, নাটকটি মানুষকে কতটা আন্দোলিত করেছিল, কতটা জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল।’
তখনকার গণমাধ্যমেও ‘কোথাও কেউ নেই’-এর শেষ পর্ব ঘিরে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘আজ বাকেরের ফাঁসি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, শেষ পর্বে মিথ্যা খুনের দায়ে বাকের ভাইয়ের ফাঁসি হওয়ার কথা। চরিত্রটি অভিনয় করেছিলেন আসাদুজ্জামান নূর। শেষ পর্ব প্রচারের আগের দিন তিনি জানিয়েছিলেন, ঘটনাটি আগে থেকেই জানা থাকায় তাঁর নিজের কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। তবে দর্শক-ভক্তদের ফোনে তিনি বেশ হয়রান হয়েছিলেন।
নাটকের গল্প, চরিত্র ও শেষ পরিণতি দর্শকদের এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে, কাল্পনিক চরিত্র বাকের ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে বাস্তবেই মিছিল হয়েছিল। তিন দশকেরও বেশি সময় পর সেই নাটকের দৃশ্য ও সংলাপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে ‘কোথাও কেউ নেই’ শুধু একটি পুরোনো নাটক নয়, বরং বাংলাদেশের টেলিভিশন ইতিহাসে দর্শকের গভীর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অনন্য অধ্যায় হয়ে আছে।