লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জমিতেই ধান চাষ নিয়ে রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। প্রতিকূল পরিবেশে ফলন ধরে রাখাও কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবে এবার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাত ‘ব্রি ধান-১১৯’। উপকূলীয় লবণাক্ত জমিতে চাষাবাদের উপযোগী এই নতুন জাতটি রোপা আমন মৌসুমে চাষের জন্য চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায়।
দীর্ঘ গবেষণার মাধ্যমে নতুন এই জাত উদ্ভাবন করেছেন ব্রির উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল। লোকেশন স্পেসিফিক টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণায় যুক্ত ছিলেন আরও কয়েকজন বিজ্ঞানী। বিশেষত্ব হলো, শুধু লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চল নয়, দেশের সাধারণ পরিবেশেও চাষ করা যাবে এই ধান। ফলে প্রতিকূল জমিতে ধান উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও নতুন জাতটি সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
চাষের সময় বিবেচনায়ও রয়েছে বাড়তি সুবিধা। ব্রি ধান-১১৯-এর জীবনকাল মাত্র ১১৫ দিন। অর্থাৎ আমন মৌসুমের ধান তুলনামূলক দ্রুত ঘরে তোলার পর একই জমিতে সরিষা কিংবা সূর্যমুখীর মতো রবি ফসল চাষের সুযোগ পাবেন কৃষকেরা। গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী, ১ থেকে ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বীজ বপন করতে হবে। ২৫ থেকে ৩০ দিন বয়সী চারা মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমিতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে রোপণ করতে হবে।
তবে নতুন জাতটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর ফলন ও লবণাক্ততা সহ্য করার সক্ষমতা। উপযুক্ত পরিচর্যায় হেক্টরপ্রতি গড়ে ৫ দশমিক ৭ টন ধান পাওয়া সম্ভব। পরিবেশভেদে ফলন হতে পারে ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত। যা প্রচলিত ব্রি ধান-৭৩-এর তুলনায় হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি। শুধু তাই নয়, চারা অবস্থায় টানা তিন সপ্তাহ পর্যন্ত ১২ ডেসিসিমেন্স পার মিটার মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে জাতটি। গাছের উচ্চতা গড়ে ১১৩ সেন্টিমিটার এবং কাণ্ড শক্ত হওয়ায় সহজে হেলে পড়ার আশঙ্কাও কম।
ফলনের পাশাপাশি ধানের গুণগত বৈশিষ্ট্যেও রয়েছে বিশেষত্ব। প্রতিটি শীষে পাওয়া যায় প্রায় ২১৫টি পুষ্ট ধান, যা ব্রি ধান-৭৩-এর তুলনায় ৭০ থেকে ৮০টি বেশি। শীষ থেকে সহজে ধান ঝরে পড়ে না। চাল মাঝারি চিকন ও সাদা রঙের, রান্নার পর ভাত হয় ঝরঝরে। ইতোমধ্যে দেশের ২০টি ভিন্ন স্থানে লবণাক্ত ও অলবণাক্ত পরিবেশে জাতটির পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। বোরো মৌসুমে চাষের জন্যও পেয়েছে জাতীয় কারিগরি কমিটির সুপারিশ। জাতীয় বীজ বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন মিললে আমনের পাশাপাশি বোরো মৌসুমেও চাষ করা যাবে।
ব্রির মহাপরিচালক মো. রফিকুল ইসলামের মতে, নতুন এই জাত উপকূলীয় কৃষকদের ধান উৎপাদনে সহায়তা করার পাশাপাশি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর প্রধান গবেষক মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের প্রত্যাশা, গবেষণাগারের সাফল্য দ্রুত কৃষকের মাঠে পৌঁছে দেওয়াই হবে এই উদ্ভাবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। সব মিলিয়ে লবণাক্ত জমিতে ধান উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে ব্রি ধান-১১৯। এখন অপেক্ষা মাঠপর্যায়ে এই জাতের সাফল্য কতটা বদলে দিতে পারে উপকূলের কৃষিচিত্র।