সারের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যয়, একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে আমদানিনির্ভরতার চাপ। বাংলাদেশের কৃষিতে দীর্ঘদিনের এই চিত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে দেশীয় এক উদ্ভাবন। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকের তৈরি ন্যানো ইউরিয়া সার পেয়েছে বাংলাদেশের পেটেন্ট। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন ও মাঠপর্যায়ে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে প্রচলিত ইউরিয়ার তুলনায় কৃষকের সার বাবদ খরচ কমতে পারে প্রায় ৯৫ শতাংশ। একই সঙ্গে সাশ্রয় হতে পারে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।

এই উদ্ভাবনের নেপথ্যে রয়েছেন যবিপ্রবির কেমিকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ন্যানোটেকনোলজি গবেষক ড. মো. জাভেদ হোসেন খান। দীর্ঘ গবেষণা ও কারিগরি যাচাই-বাছাইয়ের পর গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ পেটেন্ট অফিস থেকে ন্যানো ইউরিয়ার স্বত্ব অনুমোদন পেয়েছেন তিনি। প্রচলিত ইউরিয়া সারের বড় একটি অংশ গাছ গ্রহণ করতে পারে না। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ সার বাষ্পীভূত হয়ে কিংবা পানির সঙ্গে ধুয়ে নষ্ট হয়। ফলে কার্যকরভাবে গাছের কাজে লাগে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। আর এই অপচয় কমানোর লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে তরল ন্যানো ইউরিয়া।

প্রচলিত দানাদার সারের মতো জমিতে ছিটিয়ে দিতে হবে না এই সার। বরং স্প্রে মেশিনের সাহায্যে সরাসরি গাছের পাতায় প্রয়োগ করা হবে ন্যানো ইউরিয়া। এর অতি ক্ষুদ্র কণা পাতার রন্ধ্র দিয়ে দ্রুত শোষিত হতে পারে, ফলে গবেষকদের দাবি অনুযায়ী এর কার্যকারিতা ৯০ শতাংশেরও বেশি। সবচেয়ে বড় চমক খরচের হিসাবে। যেখানে প্রচলিত ইউরিয়া ব্যবহারে প্রতি বিঘা জমিতে কৃষকের ব্যয় হয় প্রায় ৪ হাজার ২০০ টাকা, সেখানে ন্যানো ইউরিয়ায় একই জমির জন্য খরচ হতে পারে মাত্র ২৩০ টাকা। অর্থাৎ উৎপাদন খরচে আসতে পারে প্রায় ৯৫ শতাংশ সাশ্রয়। গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, সমপরিমাণ কিংবা আরও ভালো ফলন পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

কৃষকের খরচ কমানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে এই প্রযুক্তি। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয় বিদেশ থেকে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পাশাপাশি সরকারকে দিতে হয় বিশাল অঙ্কের সার ভর্তুকি। ন্যানো ইউরিয়ার বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হলে প্রচলিত ইউরিয়ার ওপর আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি পরিবেশের জন্যও রয়েছে বাড়তি সুবিধা। প্রচলিত ইউরিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহারে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়। সরাসরি পাতায় প্রয়োগের এই প্রযুক্তি সারের অপচয় ও পরিবেশগত ক্ষতি কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে গবেষণাগারের উদ্ভাবনকে মাঠের বাস্তবতায় নিয়ে যেতেও রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি। যবিপ্রবির ন্যাম ল্যাবে ২০১৯ সাল থেকে শুরু হওয়া গবেষণার পর যশোর, বগুড়া ও গাজীপুরে বিভিন্ন ফসলের ওপর মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হয়েছে। গবেষকদের দাবি, এসব পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও আন্তর্জাতিক মানের বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় সফল হয়েছে দেশীয় এই প্রযুক্তি। এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান কোলাবায়োর সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার চুক্তিও হয়েছে। ফলে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার থেকে উদ্ভাবিত প্রযুক্তির আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উদ্ভাবনটিকে দ্রুত বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়া এবং কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়া। এজন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে উৎপাদন কারখানা স্থাপন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং কৃষকদের সঠিক প্রয়োগপদ্ধতি শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীরের মতে, এই অর্জন দেশের কৃষি খাতের জন্য গর্বের এবং উৎপাদন খরচ ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে উদ্ভাবক ড. জাভেদ হোসেন খানের প্রত্যাশা, দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে এই প্রযুক্তি। সব মিলিয়ে ন্যানো ইউরিয়ার পেটেন্ট বাংলাদেশের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলেছে। এখন দেখার বিষয়, গবেষণাগারের এই সাফল্য কত দ্রুত কৃষকের মাঠে বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে।