এক দশকেরও বেশি সময় পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ঐতিহাসিক এই সফরে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রিউজ’-এ স্বয়ং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সশরীরে উপস্থিত থেকে চীনা প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানান। সচরাচর সফররত কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানানোর প্রচলন থাকলেও, শি জিনপিংয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের প্রথা ভেঙে স্বয়ং বিমানবন্দরে উপস্থিত হওয়াকে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশ তাত্পর্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জিনপিংয়ের এই সফরে কেবল বিমানবন্দরে সরাসরি অভ্যর্থনাই নয়, রয়েছে রাজকীয় নানা আয়োজন। ট্রাম্প প্রশাসন তাঁর সম্মানার্থে প্রযুক্তি জগতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতিতে এক নৈশভোজ, হোয়াইট হাউসে বর্ণাঢ্য সামরিক সম্মাননা প্রদর্শন এবং ঐতিহ্যবাহী ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের মতো বিশেষ কর্মসূচি সূচিভুক্ত করেছে।
গত মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্পের চীন সফরের প্রেক্ষাপটের সাথে বর্তমান পরিবেশের স্পষ্ট বৈপরীত্য ফুটে উঠেছে। সেবার প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিমানবন্দরে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাতে নিজে যাননি এবং সে সফরটি কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ চুক্তি বা দ্বিপক্ষীয় সংবাদ সম্মেলন ছাড়াই শেষ হয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর ঘরোয়া রাজনীতিতে মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ ক্রমাগত বাড়ছে।
একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান সংকট, অন্যদিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তার— এসব নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া উদ্বেগ প্রশমন করতে এবং নিজের শক্তিশালী বিশ্বনেতার ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ট্রাম্পের জন্য এই মুহূর্তে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য অর্জন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
যদিও চীনের অর্থনীতিও সাম্প্রতিক কিছু ঘরোয়া চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তবুও নিজেদের বিশাল ও সুসংগঠিত বাণিজ্য ব্যবস্থার ওপর ভর করে বিশ্ব রাজনীতিতে বেইজিং এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্ত ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। গত বছর ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর ১২৫ শতাংশ পর্যন্ত চড়া শুল্ক আরোপ করলে, বেইজিংও সঙ্গে সঙ্গে সমপরিমাণ কঠোর ও কৌশলগত জবাব দিয়েছিল।
বিশেষ করে আধুনিক উচ্চপ্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরিতে ব্যবহৃত অতি প্রয়োজনীয় বিরল খনিজ উপাদান (Rare Earth Minerals) প্রক্রিয়াজাতকরণে নিজেদের বৈশ্বিক একক আধিপত্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে নতিস্বীকার করতে বাধ্য করেছিল চীন। এর ফলে ওয়াশিংটনের কৌশলগত বিশেষজ্ঞ মহল এখন বেইজিংকে আমেরিকার সমকক্ষ ও নিকটতম একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করছে।
দুই পরাশক্তি নেতার এই হাই-প্রোফাইল বৈঠকের আগেই ওয়াশিংটন ও বেইজিং চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ সাময়িক স্থগিত রাখার মেয়াদ আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত বাড়াতে সম্মত হয়েছে। বুধ ও বৃহস্পতিবারের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠক থেকে নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক খাতে অতিরিক্ত শুল্ক কমানো, আন্তর্জাতিক মাদক পাচার নিরোধে যৌথ সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং দুই দেশের সামরিক যোগাযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি আসার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।
এছাড়া চীনে বর্তমানে বন্দি কয়েকজন মার্কিন নাগরিকের মুক্তি নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালাবেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বহুল আলোচিত তাইওয়ান সংকটের স্থায়ী সমাধান নিয়ে আলোচনার তীব্র দাবি থাকলেও, ওয়াশিংটন বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যেতে চায়। একই সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং মার্কিন কৌশলগত পণ্য রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়ে দুই দেশের কেউই সহজে ছাড় দিতে রাজি নয়।