১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। মানবসভ্যতার ইতিহাসে লেখা হয় এক নতুন অধ্যায়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে পাঠায় মানুষের তৈরি প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘স্পুটনিক ১’। মাত্র ২২ ইঞ্চি ব্যাসের ছোট্ট এই গোলকটি মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে পাঠাতে থাকে বিপিং শব্দ। আকারে ছোট হলেও এর প্রভাব ছিল বিশাল। স্পুটনিক ১-এর হাত ধরেই শুরু হয় মহাকাশ জয়ের নতুন প্রতিযোগিতা, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরবর্তী কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিতে। কাজাখস্তানের বাইকনুর কসমোড্রোমের কাছাকাছি একটি উৎক্ষেপণকেন্দ্র থেকে মহাকাশে যাত্রা শুরু করে স্পুটনিক ১। কক্ষপথে পৌঁছানোর পর পৃথিবীকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে স্যাটেলাইটটি। এতে ছিল রেডিও ট্রান্সমিটার, ব্যাটারি ও প্রয়োজনীয় কিছু সরঞ্জাম। তবে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার যন্ত্র ছিল না। মূল লক্ষ্য ছিল মানুষ যে মহাকাশে একটি কৃত্রিম বস্তু পাঠাতে সক্ষম, সেটি বিশ্বকে দেখানো।

স্পুটনিক ১-এর সবচেয়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্য ছিল তার নিয়মিত বিপিং শব্দ। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের অ্যামেচার রেডিও অপারেটররাও সেই সংকেত ধরতে পারতেন। স্যাটেলাইটটি তাদের অবস্থানের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় সংকেতের পরিবর্তন শোনা যেত। ফলে শুধু বিজ্ঞানীরাই নন, সাধারণ মানুষও প্রথমবারের মতো মহাকাশ থেকে আসা একটি কৃত্রিম সংকেত সরাসরি শুনতে পান। তবে মাত্র ২২ দিন পরই এর ব্যাটারির শক্তি শেষ হয়ে যায়। পরে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে ধ্বংস হয় স্পুটনিক ১। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই সাফল্য যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করে গভীর উদ্বেগ। মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পাশাপাশি এর সামরিক সম্ভাবনাও নিয়ে শুরু হয় নতুন আলোচনা। পাল্টা জবাব দিতে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত নিজেদের মহাকাশ কর্মসূচি জোরদার করে। এরই অংশ হিসেবে শুরু হয় এক্সপ্লোরার প্রকল্প। মহাকাশ গবেষণায় পিছিয়ে না থাকার এই প্রতিযোগিতাই পরবর্তী সময়ে দুই পরাশক্তির বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও তীব্র করে।

এই প্রতিযোগিতার ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালে এক্সপ্লোরার ১ মহাকাশে পাঠায়। একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক মহাকাশ সংস্থা নাসা প্রতিষ্ঠার পথও তৈরি হয়। এরপর একের পর এক নতুন মিশন, কৃত্রিম উপগ্রহ, মানুষবাহী মহাকাশযান এবং চন্দ্রাভিযানের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে থাকে মানবসভ্যতা। কয়েক বছরের মধ্যেই মহাকাশ গবেষণা পৌঁছে যায় এমন এক পর্যায়ে, যার চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে ওঠে অ্যাপোলো মিশন। তাই স্পুটনিক ১ শুধু একটি ছোট্ট ধাতব গোলক ছিল না। সেটি ছিল মহাকাশ যুগের সূচনাবিন্দু। মাত্র ৯৬ মিনিটে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা সেই ছোট্ট উপগ্রহের বিপিং শব্দই যেন জানিয়ে দিয়েছিল মানুষের পৃথিবীর সীমানা ছাড়িয়ে মহাকাশ জয়ের সময় শুরু হয়ে গেছে। আর সেই শুরু থেকেই ধাপে ধাপে এগিয়ে আজকের আধুনিক মহাকাশ গবেষণার যুগে পৌঁছেছে মানবসভ্যতা