জর্জিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের তুরস্ক সীমান্তবর্তী স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল আদজারা। অর্থোডক্স খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ জর্জিয়ার এই অঞ্চলে মুসলিম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। উসমানীয় সাম্রাজ্যের সময়ে প্রায় চার শতাব্দী আগে আদজারায় ইসলামের বিস্তার ঘটে। বর্তমানে অঞ্চলটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মুসলিম।
আদজারার পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে ৫০টির বেশি ঐতিহাসিক কাঠের মসজিদ। ১৮১৭ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে নির্মিত এসব মসজিদ স্থানীয় স্থাপত্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তবে সময়ের সঙ্গে অনেক মসজিদ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কয়েকটি এখনো নিয়মিত নামাজের জন্য ব্যবহৃত হলেও বহু মসজিদ জরুরি সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
ঐতিহাসিক এসব স্থাপনার অন্যতম গুলেবি মসজিদ। দীর্ঘদিনের ক্ষয়ের ছাপ পড়লেও মসজিদটির কাঠের নির্মাণশৈলী, অলংকরণ, মিম্বারের নকশা এবং বিবর্ণ লাল-নীল রং এখনো এর ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করছে।
স্থানীয় অধিকারকর্মীদের মতে, এসব মসজিদের অবহেলা শুধু স্থাপনা সংরক্ষণের সংকট নয়; জর্জিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অবদান যথাযথভাবে তুলে না ধরারও প্রতিফলন।
তরুণ অধিকারকর্মী লিয়া দেকানাদজে বলেন, পাঁচ বছর আগে গুলেবি মসজিদে প্রথম যাওয়ার সময় এর যে অবস্থা দেখেছিলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই তার দৃশ্যমান অবনতি হয়েছে। তার আশঙ্কা, যথাযথ উদ্যোগ না নিলে নিজের জীবদ্দশাতেই ঐতিহাসিক মসজিদটি হারিয়ে যেতে দেখতে হতে পারে।
কাঠের মসজিদে ক্ষয়ের ছাপ
আদজারার পাহাড়ি এলাকায় কাঠ সহজলভ্য হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগ ও অর্থায়নে এসব মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। মসজিদগুলোর নকশায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের বাড়ির বৈশিষ্ট্যও ফুটে উঠেছে। ফলে এগুলো অঞ্চলটির নিজস্ব স্থাপত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সোভিয়েত শাসনের সময় ধর্মীয় কার্যক্রমের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে অনেক মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৩০-এর দশকে বেশ কিছু মসজিদ দোকান বা গুদাম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং কয়েকটির মিনারও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। তবে অনেক স্থাপনা ব্যবহারযোগ্য থাকায় তাদের মূল কাঠামো টিকে যায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কয়েকটি মসজিদে আবার ধর্মীয় কার্যক্রম শুরু হয়। খুলো এলাকার ঘোরজোমি মসজিদ এখনো স্থানীয় মুসলিমদের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক মসজিদ বর্তমানে অর্থসংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঝুঁকিতে রয়েছে।
গবেষক জিওর্গি রিঝভাদজের ভাষায়, কাঠের তৈরি হওয়ায় এসব মসজিদ আবহাওয়ার প্রভাবের কাছে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আদজারার তুষারময় শীত, আর্দ্র গ্রীষ্ম এবং পুরোনো বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা স্থাপনাগুলোর জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।
গত বছর আগুনে দুটি মসজিদ ধ্বংস হয়েছে। আগুনের সঠিক কারণ নিশ্চিত না হলেও অন্তত একটি ঘটনায় বৈদ্যুতিক ত্রুটিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সংরক্ষণে উদ্যোগ, তবে ধীরগতি
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য পুরোনো কাঠের মসজিদ সংস্কারের ব্যয় বহন করা কঠিন। এর সঙ্গে পাহাড়ধস, কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ এবং জনসংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যাও যুক্ত হয়েছে। জীবিকার সন্ধানে অনেক মানুষ আঞ্চলিক রাজধানী বাতুমিতে চলে যাচ্ছেন।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত সাতিসখুরি মসজিদ পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। আরও দুটি মসজিদের সংস্কারকাজ সম্প্রতি শেষ হয়েছে। তবে স্থানীয় গবেষক ও অধিকারকর্মীরা সংস্কারের ধীরগতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এ বিষয়ে কাজ করছিল বেসরকারি সংগঠন ‘সলিডারিটি কমিউনিটি’। সংগঠনটি ঐতিহাসিক ইসলামী স্থাপনাগুলোর মানচিত্র তৈরি, জরিপ এবং সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে আসছিল।
রিঝভাদজের মতে, তাদের উদ্যোগের আগে রাজধানী তিবিলিসিতে থাকা অনেক মানুষই আদজারার এই অনন্য কাঠের মসজিদগুলোর বিষয়ে খুব কম জানতেন।
মুসলিম ঐতিহ্য নিয়ে পরিচয়ের প্রশ্ন
অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, জর্জিয়ার জাতীয় ইতিহাসের বয়ানে মুসলিমদের অবদান যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। দেকানাদজে বলেন, দেশটিতে ইসলামকে অনেক সময় বাইরের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। অথচ আদজারার জর্জিয়ান মুসলিমরা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির সমাজ ও সংস্কৃতির অংশ।
তাদের মতে, ধর্মীয় বহুত্ববাদ সংবিধানে স্বীকৃত হলেও মুসলিম সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এখনো সীমিত।
বাতুমিতেও মুসলিমদের জন্য পর্যাপ্ত ধর্মীয় অবকাঠামো নেই বলে স্থানীয়রা জানান। শহরে একটি মসজিদ রয়েছে, যা মুসল্লিদের চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত নয়। নতুন একটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে জর্জিয়ার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও নাগরিক সংগঠনগুলোর কার্যক্রমকে প্রভাবিত করেছে। বিদেশি অর্থায়ন পাওয়া সংগঠনগুলোর ওপর বিধিনিষেধসহ ‘ফরেন এজেন্ট’ আইন নিয়ে দেশটিতে বিতর্ক ও বিক্ষোভ হয়েছে। সরকারের দাবি, এসব পদক্ষেপ জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয়; অন্যদিকে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ সমালোচকেরা এর সমালোচনা করেছে।
এই পরিস্থিতিতে ‘সলিডারিটি কমিউনিটি’ তাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছে। ফলে আদজারার ঐতিহাসিক মসজিদ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি উদ্যোগও বর্তমানে সক্রিয় নেই।
গুলেবি মসজিদ এখন আর নিয়মিত ব্যবহৃত হয় না। তবে অধিকারকর্মীদের মতে, মসজিদটি শুধু ধর্মীয় স্থাপনা হিসেবে নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও জর্জিয়ার ইতিহাসের অংশ হিসেবেও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
দেকানাদজের ভাষায়, এসব মসজিদ স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত শ্রম ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে। তাই এগুলো হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু পুরোনো কাঠের ভবন হারানো নয়—একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিরও ক্ষয়।