মাত্র কদিন আগেও ব্যাংককের বিভিন্ন সড়ক ও মোড় ছিল কর্মচঞ্চলতায় ভরপুর। কর্মব্যস্ত মানুষ আর ভ্রমণপ্রিয় পর্যটকদের ভিড়ে গমগম করত চারপাশ। রেস্তোরাঁ, শপিং মল আর ক্লাবগুলোতেও উপচে পড়ত জনসমাগম। কিন্তু মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানেই বদলে গেছে সেই চিত্র। ব্যস্ত সেই এভিনিউ এখন তলিয়ে গেছে কোমরসমান পানিতে। রাস্তাজুড়ে জলমগ্ন অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য গাড়ি। এ যেন চেনাই যাচ্ছে না দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ, থাইল্যান্ডের রাজধানীতে । ব্যাংককের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরেই টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা। আর সেই পানির মধ্যে বুকসমান পানি ঠেলে শুকনো জায়গার খোঁজে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ। কেউ সঙ্গে নিয়েছেন যতটুকু সম্ভব প্রয়োজনীয় জিনিস, কেউ আবার দিনের পর দিন পানিবন্দি হয়ে আছেন ঘরের ভেতর। কোথাও কোথাও পানি উঠে গেছে গলা পর্যন্ত। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে পানির উচ্চতা প্রায় দেড় মিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে গেছেন, আবার কেউ পর্যাপ্ত পানি ও বিদ্যুৎ না থাকায় সেখান থেকেও হেঁটে বেরিয়ে আসছেন।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বয়স্ক, অসুস্থ আর ছোট শিশুদের উদ্ধারে। স্বেচ্ছাসেবকেরা ট্রাক ও নৌকা নিয়ে ছুটছেন এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায়। সামরিক বাহিনীও সহায়তা করছে। তবে বন্যার্তদের কাছে বেশিরভাগ ত্রাণ ও সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা। একটি উঁচু জায়গা এখন পরিণত হয়েছে নৌকাগুলোর অস্থায়ী ঘাঁটিতে। সেখান থেকেই নৌকা ছুটছে পানিবন্দি মানুষদের উদ্ধারে। ব্যাংককের শ্রমজীবী মানুষের এলাকা লাত ফ্রাওয়ের চিত্র আরও ভয়াবহ। পার্কিং লটে সারি সারি গাড়ি, অথচ সবই এখন পানির নিচে।

এর মধ্যেই উদ্ধারকারী নৌকায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে তুলে আনা হচ্ছে।  তিন দিন ধরে পরিবারের সঙ্গে বাড়িতে আটকে আছেন অনেকেই । খাবার আর পানির মজুতও প্রায় শেষ। তাই এখন তার একটাই চাওয়া যেভাবেই হোক, এই এলাকা থেকে বের হয়ে যাওয়া। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল বিদেশ সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরে এসেছেন। তিনি বন্যাকবলিত মানুষের সঙ্গে দেখা করছেন এবং তাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম তদারকি করছেন।

তবে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে ব্যাংককের মানুষের মধ্যে। অনেকের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় সরকারের তৎপরতা কম এবং শুরু হয়েছে অনেক দেরিতে। নিয়াওয়ের মতো অনেকে নিজের এলাকার মানুষের জন্য পানি সংগ্রহ করতে এসেছেন। তার অভিযোগ, সরকার যথেষ্ট পদক্ষেপ নিচ্ছে না শুধু একের পর এক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তিন দিন ধরে বন্যা চলার পর এখন সেটিকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।

এর মধ্যেই বিভিন্ন জায়গায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ত্রাণসামগ্রী। কেউ সেগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কেউ বাড়িঘর দেখাশোনার জন্য পানির মধ্যেই থেকে গেছেন। কিন্তু তাদের কেউই জানেন না আর কতদিন এভাবেই পানিবন্দি থাকতে হবে। অ্যাপার্টমেন্টের প্রবেশপথগুলোও এখন অস্থায়ী ঘাট। সেখান থেকে নৌকায় উঠে নিরাপদ জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছেন মানুষ। আর ব্যাংককের যে রাস্তাগুলো দিয়ে প্রতিদিন ছুটত অসংখ্য মানুষ ও গাড়ি, সেগুলো এখন যেন পরিণত হয়েছে খালে। সেই পানির মধ্য দিয়েই প্রাণপণে নিরাপদ আশ্রয়ের দিকে ছুটছেন বাসিন্দারা আর অপেক্ষা করছেন, কখন একটি উদ্ধারকারী নৌকা এসে তাদেরও নিয়ে যাবে।