২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কার্সন। ধ্রুপদি সাহিত্যের ঐতিহ্যের সঙ্গে সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমকালীন সাহিত্যে নতুন রূপ তৈরির স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। তবে সাহিত্যজগতে তাঁর বিশেষ একটি কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী মেরিলিন মনরোর নাম।
মেরিলিন মনরোকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে লেখা হয়েছে অসংখ্য বই, তৈরি হয়েছে চলচ্চিত্র ও গবেষণাকর্ম। তাঁর সৌন্দর্য, খ্যাতি, প্রেম ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে মানুষের আগ্রহ আজও কমেনি। কিন্তু এই হলিউড তারকাকে যখন প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের গ্রিক পুরাণের এক নারী চরিত্রের পাশে দাঁড় করান কোনো সাহিত্যিক, তখন তৈরি হয় ভিন্ন এক আখ্যান।
অ্যান কার্সনের সেই ব্যতিক্রমী কাজের নাম ‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’। নর্মা জিন বেকার ছিল মেরিলিন মনরোর জন্মনাম। ২০১৯ সালে মঞ্চে আসা এই কাব্যনাট্যে কার্সন একদিকে তুলে ধরেছেন মেরিলিন মনরোকে, অন্যদিকে গ্রিক পুরাণের হেলেন অব ট্রয়কে। একজন বিংশ শতকের হলিউডের আলোচিত তারকা, অন্যজন প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের বহুল পরিচিত পৌরাণিক চরিত্র।
সৌন্দর্য, খ্যাতি ও পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি
কার্সনের লেখায় দুই ভিন্ন সময়ের এই নারীর মধ্যে উঠে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য। সৌন্দর্য ও আকর্ষণের কারণে দুজনই তাঁদের সময়ের মানুষের কল্পনা, আকাঙ্ক্ষা ও দৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিলেন।
গ্রিক পুরাণে হেলেনকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাঁকে ঘিরেই ট্রয়ের যুদ্ধের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে। অন্যদিকে মেরিলিন মনরো ছিলেন হলিউডের অন্যতম আলোচিত আবেদনময়ী তারকা। পর্দার আকর্ষণীয় উপস্থিতি তাঁকে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি এনে দেয়।
তবে দুই নারীর ক্ষেত্রেই তাঁদের ব্যক্তিসত্তার চেয়ে সৌন্দর্য ও অন্যের চোখে তাঁদের আকর্ষণ অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কার্সন এই মিলের মধ্য দিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নারীকে তাঁর নিজস্ব পরিচয়ের বদলে অন্যের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখার প্রবণতা কতটা গভীর।
কেন মেরিলিন মনরোকে বেছে নিলেন কার্সন?
প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য, পুরাণ ও ইতিহাস অ্যান কার্সনের সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কবিতা, গদ্য, নাটক, অনুবাদ ও সাহিত্যসমালোচনাকে মিশিয়ে স্বতন্ত্র রচনাশৈলী গড়ে তুলেছেন তিনি। তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’, ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’ এবং ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’।
‘নর্মা জিন বেকার অব ট্রয়’ নাটকে তিনি ইউরিপিদিসের ‘হেলেন’ নাটকের পৌরাণিক আখ্যানের সঙ্গে আধুনিক জনপ্রিয় সংস্কৃতির সংযোগ ঘটিয়েছেন। নাটকটি ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের দ্য শেডের গ্রিফিন থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়। এতে অভিনয় করেন বেন উইশ ও সোপ্রানো রেনে ফ্লেমিং। পরিচালনায় ছিলেন কেটি মিচেল।
প্রাচীন পুরাণের চরিত্র ও আধুনিক সময়ের তারকাকে পাশাপাশি রেখে কার্সন দেখিয়েছেন, সময় বদলালেও নারীর সৌন্দর্যকে ঘিরে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির কিছু প্রবণতা কীভাবে টিকে থাকে। তাঁর এই কাজ শুধু দুই নারীর তুলনা নয়; বরং খ্যাতি, পরিচয় এবং একজন নারীকে সমাজ কীভাবে দেখে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।