কল্পনা করুন , একদিন হঠাৎ আপনার স্কুলের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল বিশাল এক পেলিকান! করিডোরে হাঁটছে, শিশুদের সঙ্গে খেলছে, পিয়ানোর পাশে দাঁড়িয়ে গান শুনছে । মনে হয় যেন কোনো সিনেমার গল্প। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলেও এটি সত্য ঘটনা । জাপানের ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের উবে শহরে সত্যিই এমন এক পেলিকান ছিল, যার নাম কাত্তা-কুন। ১৯৮৫ সালে জাপানের তোয়াকি পার্কে জন্ম নেয় ছোট্ট এক কাত্তা-কুন। সে ছিল জাপানে কৃত্রিমভাবে ডিম ফুটিয়ে জন্ম দেওয়া প্রথম পেলিকান। তার বাবা-মা এসেছিল ভারতের কলকাতা থেকে, আর সেই কলকাতার নাম থেকেই তার নাম রাখা হয় কাত্তা-কুন। পার্কের কর্মীরা তাকে মানুষের হাতে বড় করে তোলায় ছোটবেলা থেকেই বন্ধুর মত সবার সাথে মিশতেন । মানুষের প্রতি তার কোনো ভয় ছিল না। বরং মানুষকেই সে নিজের আপনজন মনে করত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাত্তা-কুন তোয়াকি পার্কের সীমানা পেরিয়ে আশপাশের এলাকায় উড়ে যেতে শুরু করে। একসময় পার্ক থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরের মেইকো কিন্ডারগার্টেনে তার যাতায়াত শুরু হয়। আর সেখানেই শিশুদের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার এক অদ্ভুত সুন্দর বন্ধুত্ব। প্রতিদিন যেন নিজের ইচ্ছাতেই সে চলে আসত স্কুলে শিশুদের কাছে। কখনো তাদের সঙ্গে দৌড়াত, কখনো খেলত, আবার কখনো পিয়ানোর সুরের সঙ্গে শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে থাকত। এমনকি গান ও সঙ্গীতের তালে শিশুদের সঙ্গে নাচও করত কাত্তা-কুন। একসময় সে আর শুধু পার্কের পেলিকান ছিল না শিশুদের কাছে হয়ে উঠেছিল স্কুলের শিক্ষক শিক্ষার্থীদের একজন আপন সঙ্গী।
কাত্তা-কুনের এই অদ্ভুত বন্ধুত্বের খবর খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো জাপানে। ১৯৮৯ সালে তার শিশুদের সঙ্গে মিশে যাওয়ার দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হলে সে রাতারাতি জাতীয়ভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। তার মানুষের প্রতি অসাধারণ আস্থা আর শিশুদের প্রতি ভালোবাসাই তাকে পরিণত করে উবে শহরের অন্যতম স্লিব্রেটিতে । তার জনপ্রিয়তা এতটাই বেড়ে যায় যে ১৯৮৯ সালে জাপান অ্যানিমাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন তাকে সম্মানিত করে। এরপর ১৯৯৫ সালে তার জীবনকে ঘিরে তৈরি হয় অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র কাত্তা-কুন মোনোগাতারি’।
তবে কাত্তা-কুনের জীবন শুধু মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্বেই থেমে থাকেনি। বড় হওয়ার পর সে অন্য পেলিকানদের সঙ্গেও নিজের পরিবার গড়ে তোলে। তার সন্তান ও নাতি-নাতনিও ছিল। অর্থাৎ যে পেলিকান একসময় মানুষের মাঝেই নিজের পরিবার খুঁজে নিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সে নিজের প্রজাতির মধ্যেও একটি পরিবার তৈরি করেছিল। দীর্ঘ ২৩ বছরের জীবন শেষে ২০০৮ সালের ১৬ জুলাই তোয়াকি পার্কেই কাত্তা-কুনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শুধু উবে শহর নয়, পুরো জাপানজুড়েই নেমে আসে শোকের ছায়া । এমনকি তার প্রিয় মেইকো কিন্ডারগার্টেনের শিশুরাও তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে এসেছিল।