ধানের শীষে যখন পাকার হাতছানি, ঠিক তখনই বৃষ্টির অভাবে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমেছে দিনাজপুরের হিলির কৃষকদের মাঝে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে রোপা আমনের সবুজ সমারোহ থাকলেও কয়েকদিনের অনাবৃষ্টিতে কোথাও কোথাও মাটি ফেটে চৌচির। ফসল বাঁচাতে তাই বৃষ্টির অপেক্ষা না করে সেচের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে কৃষকদের।
বোয়ালদাড়, জালালপুরসহ কয়েকটি এলাকার জমিতে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। বৃষ্টির অভাবে ধানের গাছ শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ডিজেল ও পেট্রোলচালিত শ্যালো মেশিন দিয়ে জমিতে পানি দিচ্ছেন কৃষকেরা। কিন্তু জমিতে পানি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে খরচের হিসাবও। ফলে ভালো ফলনের স্বপ্নের পাশাপাশি এখন কৃষকের মাথায় ঘুরছে উৎপাদন ব্যয়ের চিন্তা।
এর মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে সেই চাপ যেন আরও ভারী হয়েছে। সেচযন্ত্র চালাতে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে কৃষকদের, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ধান উৎপাদনের মোট খরচে। সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য কৃষি উপকরণের বাড়তি দামের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে সেচের অতিরিক্ত ব্যয় - সব মিলিয়ে লাভের অঙ্কটা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে।
কৃষকদের ভাষ্য, আগে যে জমিতে ধান ফলাতে তুলনামূলক কম খরচ হতো, এখন একই জমিতে বাড়তি টাকা ঢালতে হচ্ছে। কোনো কোনো কৃষকের হিসাবে বিঘাপ্রতি ব্যয় কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে ফসল ঘরে তোলার পর সেই বাড়তি খরচ আদৌ উঠবে কি না, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে সংশয়। ভালো ফলন হলেও যদি উৎপাদন ব্যয় না ওঠে, তাহলে কৃষকের পরিশ্রমের শেষ হিসাবটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে - সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
শুধু সেচের খরচ নয়, হঠাৎ জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় কৃষকের দৈনন্দিন কৃষিকাজের ব্যয়ও বেড়েছে। তাই অনাবৃষ্টির সঙ্গে লড়াই করে ফসল বাঁচানোর চেষ্টা করলেও স্বস্তি নেই তাদের মনে। কৃষকদের দাবি, জ্বালানির দাম কিছুটা কমানো গেলে সেচের খরচ কমবে এবং ধান চাষে লোকসানের আশঙ্কাও কিছুটা কাটবে।
তবে কৃষকদের দুশ্চিন্তার বিপরীতে কিছুটা আশার কথাও বলছে কৃষি বিভাগ। হাকিমপুর উপজেলায় চলতি মৌসুমে ৮ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে রোপা আমনের আবাদ হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের দাবি, এখন পর্যন্ত আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূলে রয়েছে এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
সবুজ ধানের মাঠ এখন তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনা আর শঙ্কার গল্প বলছে। একদিকে পাকা ধানের অপেক্ষা, অন্যদিকে অনাবৃষ্টি ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দামে উৎপাদন খরচের বোঝা। কৃষকের ঘাম আর বিনিয়োগে যে ফসল দাঁড়িয়ে আছে, শেষ পর্যন্ত সেই ফসলই তাদের মুখে স্বস্তির হাসি ফোটাবে, নাকি বাড়তি খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে থেকে যাবে আক্ষেপ - উত্তর মিলবে ধান ঘরে ওঠার পরই।