রাশিয়ার ক্রমাগত ও ভয়াবহ বিমান হামলায় ইউক্রেনের সর্ববৃহৎ ইস্পাত কারখানাটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইস্পাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান 'আর্সেলোরমিত্তাল' আনুষ্ঠানিকভাবে এই কারখানাটি বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
গত পাঁচ সপ্তাহের ব্যবধানে চারবার ভয়াবহ হামলা চালিয়ে কারখানার ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষতিসাধন এবং অন্তত পাঁচজন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর কারখানাটির সার্বিক কর্মকাণ্ড ও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক শীর্ষ গণমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইউক্রেনীয় অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা একসময় ইউক্রেনের মোট জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৫ শতাংশই আসত এই ইস্পাত খাত থেকে। ফলে কারখানাটি বন্ধের এই সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত মারাত্মক এক আঘাত। সম্প্রতি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামো, লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক এবং কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোতে রাশিয়ার আক্রমণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ডাটাসেন্টার, খাদ্য গুদাম এবং ইন্টারনেট সরবরাহকারীদের মতো সরাসরি বেসামরিক পরিষেবাগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে মস্কো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে পঙ্গু করতে চাইছে।
প্রতিরক্ষা বাজেট ও যৌথ অর্থায়নের তাগিদ চলমান যুদ্ধ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যয় সামাল দিতে ইউক্রেন তাদের সহযোগী ও পশ্চিমা মিত্রদের কাছে অতিরিক্ত ২ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তা দাবি করেছে। একই সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে (ইইউ) প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ দ্রুত ছাড় দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জোর দিয়ে জানান, আগামী বছরের সম্ভাব্য সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা নিশ্চিত করতে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের মধ্যেই ইউক্রেনীয় বাহিনীকে নতুন করে আধুনিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের কার্যাদেশ প্রদান করতে হবে।
ট্রাম্প-জেলেনস্কি বৈঠক ও কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সফরকালে মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে মিলিত হন জেলেনস্কি। বৈঠকে জেলেনস্কি ট্রাম্পকে অনুরোধ জানান, তিনি যেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে রাশিয়ার ওপর কূটনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধে রাজি করানোর উদ্যোগ নেন। কারণ, ন্যাটো জোটের সদস্যরা ইতোমধ্যেই রাশিয়াকে যুদ্ধ পরিচালনায় সহায়তা করার জন্য চিনকে প্রধান অনুঘটক বা সহায়ক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
পুতিনের অবস্থান ও ইউরোপীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদিকে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো দেশের সঙ্গে কোনো ধরনের সরাসরি সংঘাত বা যুদ্ধে জড়ানোর পরিকল্পনা তাঁদের নেই। ন্যাটোর কিছু সদস্য দেশ রাশিয়ার দূরপাল্লার হামলার ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করার প্রেক্ষিতে পুতিন জানান, উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো ইচ্ছা তাঁদের নেই এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
পাশাপাশি ফ্রান্স ও জার্মানির আসন্ন নির্বাচনে ইউক্রেন-বিরোধী দলগুলো জয়ী হলেও ইউক্রেনের প্রতি ইউরোপের সার্বিক সমর্থন ও সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে নিশ্চিত করেছেন ইউরোপীয় শীর্ষ কর্মকর্তারা। লিথুয়ানিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেস্তুতিস বুদ্রিস এবং এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগাস সাহকনা জানিয়েছেন, ইউরোপীয় জোটের মূল অগ্রাধিকার হলো ইউক্রেনের বর্তমান সামরিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা মিটিয়ে যাওয়া।
ফ্লোরিডা জি২০ শীর্ষ সম্মেলন ও পুতিনের আমন্ত্রণ বাতিলের দাবি এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ১৪ জন সেনেটরের একটি শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় দল আগামী ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া 'জি২০' শীর্ষ সম্মেলনে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দেওয়া আমন্ত্রণ বাতিলের জন্য ট্রাম্পকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছেন। সেনেটর মিচ ম্যাককনেল, রজার উইকার ও ক্রিস কুনস সহ অন্য শীর্ষ নেতারা চিঠিতে স্পষ্ট উল্লেখ করেন, ইউক্রেনে প্রতিনিয়ত নিরীহ বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বর্বর হামলা চালিয়ে যাওয়া একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে এই ধরনের সম্মানজনক শীর্ষ সম্মেলনে সুযোগ দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।