একটা জায়গা  যেখানে দাঁড়ালে একসঙ্গে দেখা যায় তিন নদীর মিলন, চোখে পড়ে রূপালি ইলিশের গল্প, আর অনুভব করা যায় একাত্তরের রক্তাক্ত ইতিহাস। বলছি চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেডের কথা যে জায়গা শুধু ঘুরতে যাওয়ার নয়, বরং যার প্রতিটি ঢেউয়ের সঙ্গে মিশে আছে চাঁদপুরের পরিচয়।

চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেডে এসে মিলেছে পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদী। তিন নদীর বিশাল জলরাশি যেন এখানে এসে তৈরি করেছে এক অপূর্ব দৃশ্য। নদীর বুকে ছুটে চলা নৌযান, চারপাশের ব্যস্ততা আর বিকেলের সূর্যাস্ত সব মিলিয়ে মুহূর্তেই মন কাড়ে এই জায়গা। তাই দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসেন এই দৃশ্য নিজের চোখে দেখতে।

বড় স্টেশনের নদীর দিকে বেরিয়ে থাকা ত্রিকোণাকার অংশটিই পরিচিত ‘মোলহেড’ নামে। আর চাঁদপুরের কথা উঠলেই যে জিনিসটির কথা সবার আগে মনে পড়ে, সেটি হলো ইলিশ। সেই ইলিশের ঐতিহ্য ও পরিচয়ও যেন মোলহেডের সঙ্গে মিশে আছে। এখানে থাকা ইলিশ-ভিত্তিক স্থাপনাগুলো চাঁদপুরের রূপালি ইলিশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।

কিন্তু ইলিশের গল্প এখানেই শেষ নয়। বড় স্টেশনের কাছেই রয়েছে চাঁদপুরের বিখ্যাত মাছঘাট। নদী থেকে আসা রূপালি ইলিশকে ঘিরে এখানে তৈরি হয় ব্যস্ততা। ক্রেতা-বিক্রেতার হাঁকডাক, মাছের বেচাকেনা আর নদী থেকে আসা নৌকা সব মিলিয়ে এখানে প্রতিদিন যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে চাঁদপুরের নদীকেন্দ্রিক জীবন।

এই ঘাটের সঙ্গে আবার জড়িয়ে আছে দীর্ঘ নৌবাণিজ্য ও যোগাযোগের ইতিহাস। লঞ্চ ও নৌবন্দরকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্য চলে আসছে। আজও চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনাল গুরুত্বপূর্ণ নৌযোগাযোগ কেন্দ্রগুলোর একটি। তবে এই সুন্দর দৃশ্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বেদনার ইতিহাস।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বড় স্টেশন ও পুরানবাজার এলাকার নদীর মোহনায় পাকিস্তানি বাহিনীর নির্যাতনকেন্দ্র ছিল।  সেই ভয়াবহ সময়ের স্মৃতি আজও বহন করছে ‘রক্তধারা’ নামের স্মারক ভাস্কর্য। তাই মোলহেডে দাঁড়িয়ে যখন আপনি নদীর দিকে তাকাবেন, শুধু সৌন্দর্য দেখবেন না মনে হবে, এই নদী যেন নিজের বুকে বহন করে চলেছে বহু মানুষের না বলা গল্প।

চাঁদপুর বড় স্টেশন মোলহেড তাই শুধু তিন নদীর মিলনস্থল নয়। এটি ইলিশের ঐতিহ্য, মানুষের জীবন-জীবিকা, নৌবন্দরের ব্যস্ততা, সূর্যাস্তের সৌন্দর্য আর একাত্তরের বেদনার একসঙ্গে মিশে থাকা জীবন্ত ইতিহাস। হয়তো এ কারণেই, একবার চাঁদপুর মোলহেডে গেলে জায়গাটাকে শুধু দেখা হয় নাম  অনুভবও করা যায়।