আন্তর্জাতিক ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা। যে জার্সি গায়ে জড়িয়ে একের পর এক ইতিহাস লিখেছেন, সাত নম্বরের দাপটে কাঁপিয়েছেন ফুটবলবিশ্বকে , এবার সেই জার্সিকেই বিদায় জানালেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার ঘোষণা দিয়েছেন পর্তুগিজ মহাতারকা। আর কখনো জাতীয় দলের হয়ে মাঠে দেখা যাবে না পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফুটবলারকে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন রোনালদো। বিদায়বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, পর্তুগালের সাত নম্বর জার্সিটি এবার তুলে রাখার সময় এসেছে। তবে পর্তুগাল সবসময়ই থাকবে তাঁর হৃদয়ে। শৈশবে মাদেইরার ছোট্ট দ্বীপ থেকে শুরু হওয়া যে স্বপ্ন তাঁকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে নিয়ে গেছে, সেই স্বপ্নের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায়ের নাম পর্তুগাল। সতীর্থদের নিয়েও আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন সিআর সেভেন। সতীর্থদের সঙ্গে প্রতিটি দৌড়, প্রতিটি আলিঙ্গন, প্রতিটি আলোচনা, মাঠে নামার আগে কাটানো নীরব মুহূর্ত, একসঙ্গে উদযাপন করা প্রতিটি জয় এবং প্রতিটি পরাজয়ের জন্য তাঁদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
২০০৩ সালে পর্তুগালের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয় রোনালদোর। এরপর সময়ের সঙ্গে হয়ে ওঠেন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা, একসময় পান অধিনায়কের দায়িত্ব। গড়ে তোলেন আন্তর্জাতিক ফুটবলের অন্যতম সেরা গোলদাতার রেকর্ড। জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন ২৩৪ ম্যাচ, করেছেন ১৪৬ গোল। তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে পর্তুগাল। এরপর ২০১৯ ও ২০২৫ সালে জেতে উয়েফা নেশন্স লিগের শিরোপাও। ব্যক্তিগত অর্জন আর দলীয় সাফল্যে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে নিজের নামটি করে নিয়েছেন চিরস্থায়ী। অসাধারণ প্রতিভা আর পারফরম্যান্সে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছেন নিজের দেশকে।
তবে এত এত অর্জনের মাঝেও একটা আক্ষেপ হয়তো থেকেই যাবে রোনালদোর। সেটি বিশ্বকাপের ট্রফি ছুঁয়ে দেখার স্বপ্ন। জাতীয় দলের সেই সাত নম্বর জার্সি গায়ে দেশের হয়ে বিশ্বকাপ জিততে পারলেই হয়তো পূর্ণতা পেত সিআর সেভেনের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবে সোনালি ট্রফিতে চুমু আঁকতে না পারলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে গড়েছেন একাধিক অনন্য রেকর্ড। সর্বোচ্চ ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ছয় আসরেই গোল করার কীর্তি রয়েছে তাঁর। ভাগ্য সবার সহায় হয় না, রোনালদোর ক্ষেত্রেও হয়তো তাই। বিশ্বকাপের ট্রফি অধরাই রেখে জাতীয় দলকে বিদায় জানাতে হচ্ছে তাঁকে।
২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকে ছিটকে যাওয়ার পরই আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পর্তুগিজ মহাতারকা। তবে ফেডারেশনের অনুরোধ এবং কোচ হোর্হে জেসুসের পরিকল্পনায় সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্তই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায় রোনালদোর জন্য। বাজে পারফরম্যান্স, বেঞ্চে বসে থাকা এবং কোচের সঙ্গে মনোমালিন্য সব মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত জাতীয় দল থেকে বিদায়ের ঘোষণা দেন তিনি।
জয়-পরাজয়ের হিসাব ছাপিয়ে রোনালদো তাঁর কোটি কোটি ভক্তের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম, এক আইডল। খেলোয়াড় বদলাবে, সময় বদলাবে, কিন্তু পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর ২৩ বছরের সেই মহাকাব্যিক পথচলা ফুটবলপ্রেমীদের মনে থেকে যাবে চিরকাল।