প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের কৃষির জন্য নতুন কোনো বাস্তবতা নয়। তবে চলতি বছরের আকস্মিক বন্যা যেন সেই পুরোনো ক্ষতকেই আরও গভীর করেছে। পানির স্রোতে তলিয়ে গেছে ফসলি জমি, নষ্ট হয়েছে বীজতলা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাছের ঘের ও প্রাণিসম্পদ। সব মিলিয়ে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭৮ কোটি টাকা। এই বিপুল ক্ষতি সামলে আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন দেশের কৃষকরা।
ক্ষতির সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে কৃষিখাতেই। ৪৩টি জেলায় প্রায় ৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর চাষযোগ্য জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে উৎপাদন কমেছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৯৭২ টন, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকা। বিশেষ করে আমনের বীজতলা ও রোপণ করা চারা, আউশ ধান, পাট এবং নানা ধরনের সবজি বন্যার পানিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর এই ক্ষতির প্রভাব পড়েছে সরাসরি বাজারেও।
কারণ, মাঠে ফসল কমলে বাজারে সরবরাহেও তার ছাপ পড়ে। এবারের বন্যায় বেগুন, মরিচ, টমেটো, ঢ্যাঁড়শ, শসা, লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর সবজি আবাদি জমির মধ্যে ৮ হাজার ৮৩৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার ৯৬৭ টন। শুধু সবজিতেই আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ২৩২ কোটি টাকা। তবে ক্ষতির হিসাব এখানেই শেষ নয়।
বন্যার পানিতে মাছের ঘের ও পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মৎস্য খাতেও প্রায় ৩৬৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগিসহ প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ফলে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইটা শুধু জমিতে নতুন ফসল ফলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বন্যার পর প্রাণিসম্পদ ও মাছের উৎপাদনও স্বাভাবিক করতে হচ্ছে। আর এই পুনরুদ্ধারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে সঠিক পরিকল্পনা।
কৃষি গবেষকদের পরামর্শ, পানি নেমে যাওয়ার পর জমির অবস্থা বুঝে দ্রুত নতুন ফসলের পরিকল্পনা করতে হবে। যেসব জমিতে আমন ধান করা সম্ভব নয়, সেখানে স্বল্পমেয়াদি ধান, সবজি কিংবা মসলা জাতীয় ফসল বেছে নেওয়া যেতে পারে। এলাকাভেদে ব্রি ধান ২২, ব্রি ধান ২৩, ব্রি ধান ৩৪, ব্রি ধান ৪৬, বিনা ধান ৭, ১৭ ও ২২-এর মতো উপযোগী জাত চাষ করা সম্ভব। পাশাপাশি মাসকলাই, পালং, ডাটা, গিমা কলমিসহ দ্রুত বেড়ে ওঠা ফসলও কৃষকের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে।
তবে শুধু নতুন ফসল লাগালেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর গবাদিপশুর রোগবালাই বাড়তে পারে, তাই প্রাণিসম্পদের বিশেষ যত্ন জরুরি। একই সঙ্গে বন্যাপ্রবণ এলাকার কৃষকদের আগাম সতর্কবার্তা, নিরাপদ স্থানে হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু সরিয়ে নেওয়া, মানসম্মত বীজ সংরক্ষণ এবং বন্যা-পরবর্তী সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো গেলে দুর্যোগের ধাক্কা সামলে ওঠার সক্ষমতাও বাড়বে।
আর দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন আরও টেকসই প্রস্তুতি। জলাবদ্ধতা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, খাল-নালা সংস্কার করে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, জরুরি সময়ে সার ও বীজের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং শস্যবীমার মতো ব্যবস্থার বিস্তার কৃষকের ঝুঁকি কমাতে পারে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ও জলবায়ু অভিযোজন কৌশলকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কারণ বন্যাকে পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত প্রস্তুতি আর সময়োপযোগী কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষতির মাত্রা কমিয়ে কৃষককে আবারও স্বপ্নের ফসল ফলানোর সুযোগ করে দেওয়া সম্ভব।