ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা নিজের বাসা। কিন্তু ভবনটি ভূমিকম্প সহনশীল না হলে সেটিই বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে অপরিকল্পিত নির্মাণ, বিল্ডিং কোড না মানা ও কাঠামোগত ত্রুটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
তবে শুধু চোখে দেখে কোনো ভবনকে নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা যায় না। কিছু দৃশ্যমান লক্ষণ প্রাথমিকভাবে সতর্ক করতে পারে। চূড়ান্তভাবে ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাই করতে প্রয়োজন যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মূল্যায়ন।
যেসব লক্ষণ গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন
দেওয়ালে বড় বা তির্যক ফাটল: দরজা-জানালার কোণে তির্যক ফাটল বা ক্রমশ বড় হতে থাকা ফাটল কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তবে প্লাস্টারের ফাটল আর কাঠামোগত ফাটল এক নয়।
পিলার-বিমে ফাটল: পিলারে গভীর ফাটল, কংক্রিট খসে রড বেরিয়ে আসা, রডে মরিচা বা বিমের সংযোগস্থলে ক্ষতি দেখা গেলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।
নিচতলায় অতিরিক্ত খোলা জায়গা: পার্কিং বা দোকানের জন্য নিচতলা বেশি খোলা এবং ওপরের তলায় তুলনামূলক বেশি দেয়াল থাকলে ‘সফট স্টোরি’র ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে প্রকৌশলসম্মত নকশা থাকলে এমন ভবন নিরাপদও হতে পারে।
ভবন হেলে যাওয়া বা বিকৃতি: ভবন হেলে পড়া, মেঝে অস্বাভাবিকভাবে বসে যাওয়া বা কাঠামোয় দৃশ্যমান বিকৃতি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
নকশাবহির্ভূত পরিবর্তন: অনুমোদিত নকশার বাইরে পিলার, বিম বা ভারবহনকারী দেয়ালে পরিবর্তন এবং প্রকৌশলগত যাচাই ছাড়া অতিরিক্ত তলা নির্মাণ ভবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
শুধু ফাটল দেখেই কি ঝুঁকি বোঝা যায়?
না। ফাটল থাকলেই ভবন ভূমিকম্পে ধসে পড়বে—এমন নয়। আবার বাইরে কোনো ফাটল না থাকলেও ভবনের ভেতরের কাঠামো বা ভিত্তিতে দুর্বলতা থাকতে পারে।
ভবনের ভূমিকম্প সহনশীলতা নির্ভর করে নকশা, নির্মাণসামগ্রীর মান, নির্মাণকাজের তদারকি, মাটির বৈশিষ্ট্য, পিলার-বিম-শিয়ার ওয়াল ও ভিত্তির কাঠামো এবং পরবর্তী সময়ে কোনো অননুমোদিত পরিবর্তন করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ের ওপর।
বাসার নিরাপত্তা যাচাই করবেন যেভাবে
প্রথমে ভবনের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করুন। নির্মাণের সময় প্রযোজ্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC) অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা যাচাই করুন।
এরপর অভিজ্ঞ ও যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর মাধ্যমে ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন করান। প্রয়োজন হলে কংক্রিট, রড, মাটি ও অন্যান্য বিশেষায়িত পরীক্ষা করা হতে পারে।
ভবনে নতুন ফাটল, পিলারের ক্ষতি বা অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ভূমিকম্পের পর জরুরি সতর্কতা
ভূমিকম্পের পর ভবনে বড় নতুন ফাটল, পিলার-বিমের ক্ষতি, কংক্রিট খসে পড়া বা ভবন হেলে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেলে নিরাপদে বেরিয়ে আসুন। পরীক্ষা না হওয়া পর্যন্ত ভবনে প্রবেশ করবেন না।
গ্যাসের গন্ধ পেলে আগুন বা বৈদ্যুতিক সুইচ ব্যবহার না করে সংশ্লিষ্ট জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন।
বিশেষজ্ঞের মূল্যায়নই চূড়ান্ত
ভবন পুরোনো হলেই অনিরাপদ বা নতুন হলেই ভূমিকম্প সহনশীল—এমন ধারণা ঠিক নয়। ভবনের নিরাপত্তা নির্ভর করে নকশা, নির্মাণমান, মাটির অবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ ও কাঠামোগত সক্ষমতার ওপর।
তাই দৃশ্যমান লক্ষণগুলোকে প্রাথমিক সতর্কসংকেত হিসেবে বিবেচনা করে ভবনের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যোগ্য কাঠামো প্রকৌশলীর পেশাদার মূল্যায়ন করানোই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।