একটি ধারণা ও পাঁচ সদস্য নিয়ে ২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) এরিয়াল রোবোটিকস টিম (ইউআরটি)। দুই বছরের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা রোবোনেশন আয়োজিত ‘স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস ২০২৬’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিশ্বে চতুর্থ হয়েছে দলটি। প্রতিযোগিতায় ৬৫১ পয়েন্ট অর্জন করে ইউআইইউ।
ইউআরটির যাত্রা শুরু হয় টি এম আল আনামসহ কয়েকজন সিনিয়রের উদ্যোগে এবং অধ্যাপক এ কে এম মুজাহিদুল ইসলামের সহযোগিতায়। শুরু থেকেই লক্ষ্য ছিল আনম্যানড এরিয়াল রোবোটিকস প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের সক্ষমতাকে বিশ্বপর্যায়ে তুলে ধরা। তবে শুরুতে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা থাকায় দলটির কার্যক্রমে নানা চ্যালেঞ্জ ছিল।
২০২৫ সালে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর হার্ডওয়্যার উন্নয়ন ও সিস্টেম ইন্টিগ্রেশনের কাজ শুরু হয়। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ক্যাম্পাসে নিজস্ব ল্যাবরেটরি করার জায়গা পাওয়ার পর দলটির কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়। নতুন সদস্য যুক্ত হয়ে দলের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ জনে। মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, সফটওয়্যার অ্যান্ড নেভিগেশন, কমিউনিকেশন, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং জনসংযোগ ও বিপণন—এই ছয়টি উপদলে ভাগ হয়ে তারা কাজ শুরু করেন।
দলটির মূল লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার টালসার স্কাইওয়ে রেঞ্জে অনুষ্ঠিত রোবোনেশনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা ‘স্টুডেন্ট আনম্যানড এরিয়াল সিস্টেমস ২০২৬’-এ অংশ নেওয়া। অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন, এমবেডেড সিস্টেম ও মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমন্বয়ে তৈরি করা হয় স্বয়ংক্রিয় ড্রোনটি।
ড্রোনটিতে যুক্ত করা হয় স্বায়ত্তশাসিত নেভিগেশন সিস্টেম, এরিয়াল ম্যাপিং, কম্পিউটার ভিশন ও ডেটাসেট মডেল এবং বাধা শনাক্ত ও এড়িয়ে চলার সেন্সিং প্রযুক্তি। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতিতে দলের সদস্যরা ল্যাবে দীর্ঘ সময় কাজ করেন। মেয়েরা বাসায় ফেরার পরও গুগল মিটে যুক্ত থেকে দলের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
প্রস্তুতির সময় শিক্ষকেরাও নিয়মিত বিভিন্ন প্রশ্ন ও পরীক্ষার মাধ্যমে দলের দুর্বলতা চিহ্নিত করতে সহায়তা করেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত আট সদস্যের একটি দলের সামনে ইউআরটি সদস্যদের পরীক্ষাও দিতে হয়।
১৪ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় চূড়ান্ত প্রতিযোগিতা। ভিসাসংক্রান্ত নতুন নিয়মের কারণে বাংলাদেশ থেকে পাঁচজন সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেন। তারা হলেন কো-টিম লিড আহমেদ জুনায়েদ, মেকানিক্যাল টিমের মুক্তাদিরুল ইসলাম ও দিগন্ত কর্মকার, নেভিগেশন লিড ফাহাদ রহমান এবং কমিউনিকেশন লিড ইফতা ফয়সাল। দলের মেন্টর হিসেবে ছিলেন রিয়াসাত আজিম। প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজনের পাশাপাশি বাংলাদেশে থাকা অন্য সদস্যরাও প্রভাষক আজিজুর রহমানের দিকনির্দেশনায় যুক্তরাষ্ট্রে থাকা দলের সঙ্গে গুগল মিটে যুক্ত ছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর প্রতিযোগীদের কঠিন চাপের মধ্যে প্রস্তুতি নিতে হয়। তারা তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমানোর সুযোগ পাননি। প্রতিযোগিতার কিছুক্ষণ আগে ড্রোনের ‘পেলোড ড্রপ সিস্টেমে’ ত্রুটি দেখা দিলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ওই অংশের ওপর উল্লেখযোগ্য নম্বর নির্ভর করছিল। এর আগে প্রতিযোগিতায় ড্রোন ক্র্যাশ করার ইতিহাস থাকায় উদ্বেগও ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে থাকা পুরো দল একসঙ্গে কাজ করে শেষ পর্যন্ত সমস্যাটি সমাধান করে।
প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৮৫টি নিবন্ধিত দলের মধ্য থেকে নির্বাচিত ১০ দেশের ৬৪টি দল অংশ নেয়। এর মধ্যে কর্নেল ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া টেক, মোনাশ ইউনিভার্সিটি ও ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠানও ছিল।
ফল ঘোষণার সময় বাংলাদেশে ভোর ৪টা ২৬ মিনিটে ইউআইইউর সদস্যরা গুগল মিটে যুক্ত ছিলেন। ‘মিশন ডেমোনস্ট্রেশন’-এ ৬৫১ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থান অর্জনের ঘোষণা আসার পর দলের সদস্যদের মধ্যে তৈরি হয় উচ্ছ্বাস। প্রথমবারের অংশগ্রহণেই বিশ্বমঞ্চে এমন সাফল্য ভবিষ্যতের জন্য বড় অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন তারা।