কোটি কোটি ভক্ত, হলিউডের ঝলমলে জীবন, দামি পোশাক, মঞ্চের আলো আর নিজের কোটি ডলারের ব্যবসা বাইরে থেকে সেলেনা গোমেজের জীবন যেন রূপকথার মতো। অভিনয় ও সংগীত দুই ক্ষেত্রেই সেলেনা গোমেজ নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। ডিজনি চ্যানেলের ‘দ্য উইজার্ডস অব ওয়েভারলি প্লেস’ দিয়ে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর ‘স্প্রিং ব্রেকার্স’ ও ‘হোটেল ট্রান্সিলভেনিয়া’-র মতো সিনেমায় কাজ করে বড় পর্দাতেও পরিচিতি পান। পরে সংগীত, অভিনয় ও নিজের ব্যবসা সব মিলিয়ে ঝলমলে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পরিণত হয়েছে তার পথচলা। মনে মনে আপনি হয়ত একবার হলেও সেলেনার মত একটা বিলাস বহুল জীবন চেয়েছেন । কিন্তু এই হাসিমাখা মুখের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এমন এক লড়াই, যা তাকে খুব অল্প বয়সেই বাস্তব জীবনের কঠিন দিক চিনিয়ে দিয়েছে।
মাত্র ৭ বছর বয়সে অভিনয়ের জগতে পা রাখেন সেলেনা। এরপর ‘বার্নি অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’, ডিজনি চ্যানেলের দ্য উইজার্ডস অব ওয়েভারলি প্লেস, গান আর সিনেমা ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বজুড়ে পরিচিত তারকা। কিন্তু ২১ বছর বয়সেই তার জীবনে আসে বড় ধাক্কা। সেলেনার লুপাস ধরা পড়ে এটি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা নিজের শরীরের বিভিন্ন অংশকে আক্রমণ করতে পারে।
লুপাসের কারণে তার কিডনিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০১৭ সালে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে তার কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হয়। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ফ্রান্সিয়া রাইসা তাকে কিডনি দান করেন। সেলেনা নিজেই পরে জানিয়েছেন, প্রতিস্থাপনের পরও সুস্থ থাকতে তাকে নিয়মিত নিজের শরীরের প্রতি বাড়তি যত্ন নিতে হয়। শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গেও লড়াই করেছেন সেলেনা। তিনি প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তিনি বাইপোলার ডিসঅর্ডারের সঙ্গে বসবাস করছেন এবং অতীতে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন। এসব নিয়ে কথা বলার উদ্দেশ্য ছিল নিজের কষ্ট লুকিয়ে না রেখে অন্যদেরও যেন মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে উৎসাহ দেওয়া যায়।
কিন্তু এখানেই সেলেনার গল্প থেমে যায়নি। ২০২০ সালে তিনি শুরু করেন ‘রেয়ার বিউটি’। কয়েক বছরের মধ্যেই এই প্রসাধনী ব্যবসা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সাফল্যগুলোর একটি হয়ে ওঠে। পাশাপাশি ‘রেয়ার ইমপ্যাক্ট ফান্ড’-এর মাধ্যমে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন তিনি। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তহবিল ৩০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সংগ্রহ করেছে।
আর সম্পদের কথা বললে এখানেও আছে বড় বিতর্ক। ব্লুমবার্গের হিসাবে ২০২৪ সালে সেলেনার সম্পদের মূল্য প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ধরা হয়েছিল। কিন্তু ফোর্বস ২০২৫ সালে তার সম্পদের হিসাব প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি বলেছিল। অর্থাৎ সেলেনা সত্যিই বিলিয়নিয়ার কি না, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসগুলোর মধ্যেই মতপার্থক্য রয়েছে। তাই সেলেনা গোমেজের গল্পটা শুধু কোটি টাকার সম্পদ, তারকাখ্যাতি আর ঝলমলে জীবনযাপনের গল্প নয়। একজন শিশু অভিনেত্রী থেকে বিশ্বখ্যাত শিল্পী, এরপর উদ্যোক্তা এই পুরো পথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে লুপাস, কিডনি প্রতিস্থাপন, মানসিক স্বাস্থ্যের লড়াই এবং বারবার নিজেকে সামলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার গল্প। আলোর নিচে দাঁড়িয়ে থাকা এই তারকার জীবন তাই মনে করিয়ে দেয় ক্যামেরার সামনে যতই ঝলমলে হোক, প্রতিটি মানুষের জীবনেই এমন কিছু লড়াই থাকে, যা পর্দার ওপারে দেখা যায় না।