বাংলাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে রোবোটিক সার্জারি। রাজধানীর ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে রোবটের সহায়তায় ইতিমধ্যে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রোপচার শুরু হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে জটিল অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হওয়ায় এ পদ্ধতিতে রোগীর ব্যথা, রক্তপাত ও শারীরিক ধকল তুলনামূলক কম হতে পারে। একই সঙ্গে অস্ত্রোপচারের পর দ্রুত স্বাভাবিক জীবনেও ফিরতে পারেন রোগীরা।
এরই মধ্যে ১১ বছর বয়সী এক শিশুর মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিসের চিকিৎসায় রোবোটিক সার্জারি করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে স্নায়ুর এই রোগে ভুগছিল শিশুটি এবং উচ্চমাত্রার ওষুধ নিতে হচ্ছিল। রোগ নিরাময়ের জন্য অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হলেও প্রচলিত পদ্ধতিতে বুকের হাড় কেটে অস্ত্রোপচার করতে হয় বলে শিশুটি ও তার পরিবার এতে রাজি হচ্ছিল না। এভাবে প্রায় ছয় মাস কেটে যায়।
পরে ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদের তত্ত্বাবধানে শিশুটির চিকিৎসা শুরু হয়। গত ২ সেপ্টেম্বর রোবটের সহায়তায় তার অস্ত্রোপচার করা হয়। এতে বুক কাটার প্রয়োজন হয়নি; ছোট কয়েকটি ছিদ্রের মাধ্যমেই অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। অস্ত্রোপচারের পরদিন সকালেই চিকিৎসকের সঙ্গে ফুটবল খেলেছে শিশুটি।
অধ্যাপক মোফাসসেল উদ্দীন আহমেদ বলেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পর রোগীকে দীর্ঘ সময় ভারী কাজ ও খেলাধুলা থেকে বিরত থাকতে হয়। তবে রোবোটিক সার্জারির পর শিশুটির দ্রুত স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। চিকিৎসকের অনুমতি নিয়েই অস্ত্রোপচারের পরদিন সে ফুটবল খেলেছে।
কীভাবে কাজ করে রোবোটিক সার্জারি
রোবোটিক সার্জারিতে রোবট নিজে থেকে অস্ত্রোপচার করে না। পুরো প্রক্রিয়ায় সার্জনই মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন। সার্জন একটি ত্রিমাত্রিক মনিটরের মাধ্যমে রোগীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দৃশ্য দেখেন এবং রোবোটিক বাহুগুলো পরিচালনা করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন।
অধ্যাপক রফিকুস সালেহীন জানান, প্রচলিত অস্ত্রোপচারে সার্জন নিজের হাতে যন্ত্র পরিচালনা করেন। রোবোটিক পদ্ধতিতে সেই কাজটি রোবোটিক বাহুর মাধ্যমে করা হলেও নিয়ন্ত্রণ থাকে সার্জনের হাতেই। রোবোটিক যন্ত্রগুলো তুলনামূলক বেশি নমনীয় হওয়ায় জটিল ও সূক্ষ্ম জায়গায় কাজ করা সহজ হয়।
তার ভাষায়, বিশ্বের অনেক দেশে আগে থেকেই রোবোটিক সার্জারি চালু থাকলেও বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। দেশে এ প্রযুক্তির মাধ্যমে অস্ত্রোপচার শুরু হওয়াকে তিনি চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারে ব্যবহৃত রোবটটির নাম ‘মেডবট তুমাই এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবট’। চীনে তৈরি এই রোবট ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা সেখানে দুই দফা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণের সময় কৃত্রিম অঙ্গ ও প্রাণীর অঙ্গে ধাপে ধাপে অস্ত্রোপচারের অনুশীলন করেন তাঁরা। পরে চীনা চিকিৎসকদের সঙ্গে মানুষের অস্ত্রোপচারেও অংশ নেন এবং রোবোটিক সার্জারির সার্টিফিকেট অর্জন করেন।
রোবটটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দেশে আনা হলেও অস্ত্রোপচারের জন্য সরকারি অনুমতি ছিল না। অনুমতি পাওয়ার পর গত মাসে প্রথম অস্ত্রোপচার শুরু হয়। অধ্যাপক রফিকুস সালেহীনের তথ্য অনুযায়ী, ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ১২ জন রোগীর রোবোটিক সার্জারি করা হয়েছে এবং তাঁরা সবাই সুস্থ আছেন।
জটিল অস্ত্রোপচারে সুবিধা
ইউরোলজি বিভাগেও রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার শুরু হয়েছে। ১৭ বছর বয়সী এক রোগীর কিডনির সঙ্গে মূত্রনালির সংযোগস্থলের সংকীর্ণতা দূর করতে পাইলোপ্লাস্টি করা হয় রোবটের সহায়তায়।
ইউনাইটেড হেলথকেয়ারের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান ও কনসালট্যান্ট হাসিনা সাদিয়া খান বলেন, রোগীটি চিকন হওয়ায় পেটে ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল। রোবোটিক পদ্ধতিতে অল্প জায়গার মধ্যেই প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হয়েছে।
চিকিৎসকেরা জানান, রোবোটিক সার্জারির অন্যতম সুবিধা হলো অস্ত্রোপচারের সময় শরীরের অঙ্গ ও গঠন বড় করে দেখা যায়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ গুণ পর্যন্ত বড় করে দেখার সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে সার্জনের হাতের স্বাভাবিক কাঁপুনি বা ট্রেমরও ফিল্টার করা যায়। ফলে আশপাশের টিস্যু কম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সূক্ষ্মভাবে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়।
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সামছাদ জাহান বলেন, ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার হওয়ায় রক্তপাত ও শারীরিক ধকল তুলনামূলক কম হয়। ফলে রোগী কম সময়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
খরচ বেশি, তবে সম্ভাবনাও রয়েছে
রোবোটিক সার্জারির অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর খরচ। দেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচারের ব্যয় ল্যাপারোস্কপিক সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি। তবে চিকিৎসকদের মতে, বিদেশে একই ধরনের অস্ত্রোপচারের তুলনায় বাংলাদেশে খরচ কম।
চিকিৎসকদের আশা, দেশে রোবোটিক সার্জারি চালু হওয়ায় জটিল চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে। এতে চিকিৎসাবাবদ দেশের অর্থও দেশেই রাখা সম্ভব হবে। সময়ের সঙ্গে এ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে খরচও কমে আসতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
এ ছাড়া ভবিষ্যতে বিদেশি অভিজ্ঞ সার্জনদেরও অনলাইনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনীয় অনুমতি সাপেক্ষে তাঁরা দূর থেকে অস্ত্রোপচার তদারকি বা অংশগ্রহণ করতে পারবেন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
ক্যানসারের চিকিৎসায় রোবোটিক সার্জারির ব্যবহার বিশেষভাবে বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা। আগামী দিনে কোলন, পাকস্থলী, অন্ত্র, কিডনি, প্রোস্টেট ও জরায়ুর বিভিন্ন অস্ত্রোপচারে এ প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের চিকিৎসকদের রোবোটিক সার্জারির প্রশিক্ষণের জন্য এখনো বিদেশে যেতে হয়, যা ব্যয়বহুল। তাই ভবিষ্যতে দেশেই নতুন চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অধ্যাপক সামছাদ জাহানের মতে, দেশে প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি হলে নতুন চিকিৎসকদের জন্য এই প্রযুক্তি শেখা আরও সহজ হবে।