২০২১ সালের জানুয়ারির এক সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দেয় শাফায়াত-ই-রাব্বি ওয়াজেদের জীবন। গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে ফ্লাইওভারের পিলারে ধাক্কা লাগলে গুরুতর আহত হন তিনি। মাথায় প্রচণ্ড আঘাতের পর হাসপাতালে দীর্ঘ চিকিৎসা চলে। প্রায় দেড় মাসের সেই সময়ের অনেক কিছুই তাঁর মনে নেই। পরে যখন ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন, দুর্ঘটনায় তিনি দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন এবং আর কখনো দেখতে পারবেন না তখন সামনে নেমে আসে অন্ধকার এক বাস্তবতা। কিন্তু সেই অন্ধকারকে নিজের জীবনের শেষ অধ্যায় হতে দেননি শাফি।

দৃষ্টিশক্তি হারানোর পরও অন্যের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে চাননি তিনি। দুর্ঘটনার সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন শাফি। ভাই হাসনাতের সহযোগিতায় বাড়িতে বসেই নতুন করে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ব্যবহার শেখা শুরু করেন। টাইপিং, ইন্টারনেট ব্রাউজিং থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের দক্ষতা অর্জন করেন। পরে মোহাম্মদপুরের ভিজ্যুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটিতে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে সাদা ছড়ি দিয়ে চলাফেরাও শেখেন। স্ক্রিন রিডিং সফটওয়্যারের সাহায্যে এখন তিনি স্মার্টফোন ও কম্পিউটার ব্যবহার করেন, অফিসের কাজ করেন, ইন্টারনেট চালান সবই নিজের মতো করে।

পরিশ্রমের সেই পথ তাঁকে নিয়ে যায় ইউনিলিভার বাংলাদেশে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে সেখানে ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান শাফি। চার মাস পর পান পূর্ণকালীন চাকরির প্রস্তাব। শুরুতে প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত কীভাবে করবেন, তা নিয়ে পরিবারে দুশ্চিন্তা ছিল। কিন্তু শাফি সমাধানও খুঁজে নেন নিজেই। রাইড শেয়ারিং বাইকে নিয়মিত অফিসে যাওয়া-আসা শুরু করেন। আজ তিনি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটির অপারেশনস এক্সিকিউটিভ। একজন দৃষ্টিহীন তরুণের জন্য প্রতিদিনের এই স্বাভাবিক জীবনযাপন হয়তো অন্য কারও চোখে সাধারণ; কিন্তু শাফির কাছে এটি দীর্ঘ লড়াইয়ের অর্জন।

তবে শাফির গল্প এখানেই শেষ নয়। ছোটবেলা থেকেই মানুষকে হাসাতে ভালোবাসতেন তিনি। দুর্ঘটনার পর সেই ভালো লাগাটাই একসময় নতুন রূপ নেয়। ভারতের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ান ভাব্য শাহের পরিবেশনা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। বন্ধুদের উৎসাহে ঢাকার নাভিদ’স কমেডি ক্লাবের ওপেন সেশনে প্রথমবার মঞ্চে ওঠেন। এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি। এখন পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট ও কমেডি ক্লাবে ১৭টি শো করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের ৮ মে প্রায় ৭০ জন দর্শক টিকিট কেটে তাঁর অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন দিনটি আজও তাঁর কাছে বিশেষ। নিজের অন্ধত্ব, অফিসে যাতায়াত, মানুষের নানা প্রশ্ন কিংবা বিব্রতকর পরিস্থিতি জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতাগুলোই শাফি পরিণত করেন হাসির গল্পে।

নিজের সেই গল্প আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গত বছরের আগস্টে ‘শাফি আনসিন’ নামে ফেসবুক পেজে নিয়মিত ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন। বন্ধু ও সহকর্মী কমেডিয়ান তাশদীদ ভিডিও সম্পাদনায় সহযোগিতা করলেও পেজের অনেক কাজ নিজেই করেন শাফি। ভিডিও আপলোড করা থেকে শুরু করে মন্তব্য ও মেসেজের উত্তর দেওয়া সবই করেন স্ক্রিন রিডিং প্রযুক্তির সাহায্যে। তাঁর কয়েকটি ভিডিও ইতিমধ্যে দুই লাখের বেশি মানুষ দেখেছেন। তবে জনপ্রিয়তার চেয়েও তাঁর কাছে বড় বিষয় হলো, মানুষ যেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনকে শুধু করুণা দিয়ে না দেখে। তাঁদেরও স্বপ্ন আছে, প্রতিভা আছে, সৃজনশীলতা আছে এই কথাটাই নিজের গল্পের মাধ্যমে বলতে চান তিনি।

শাফির জীবনে অন্ধকার নেমে এসেছিল হঠাৎ করেই। কিন্তু সেই অন্ধকার তাঁকে থামিয়ে দিতে পারেনি। সাদা ছড়ি হাতে একা পথ চলা, স্মার্টফোনে কাজ করা, কম্পিউটারে অফিসের দায়িত্ব সামলানো, রাইড শেয়ারিং বাইকে চড়ে কর্মস্থলে যাওয়া প্রতিটি কাজের মধ্যেই আছে তাঁর নতুন করে বাঁচার গল্প। আর দিনের শেষে মঞ্চে উঠে যখন নিজের কষ্টের গল্পেই অন্যদের হাসান, তখন সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক অসাধারণ লড়াই। শাফি জানেন, তাঁর চোখে আর আলো ফিরবে না। কিন্তু জীবনের প্রতি তাঁর যে আলো, সেটি এখনো জ্বলছে। আর সেই আলো নিয়েই তিনি এগিয়ে যেতে চান থামতে নয়, বারবার নতুন করে শুরু করতে।