বিশ্বজুড়ে এখন কে-বিউটি বা কোরিয়ান সৌন্দর্যচর্চার ব্যাপক রমরমা অবস্থা। কোরিয়ান নারীদের মতো স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, দীপ্তিময়, মসৃণ ও টানটান ত্বক পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেকেরই থাকে। তবে তাদের এই অনিন্দ্য সুন্দর ত্বকের রহস্য শুধু বাহ্যিক প্রসাধনসামগ্রীতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে রয়েছে সঠিক খাদ্যভ্যাস বা 'বিউটি ডায়েট' এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল একটি জীবনযাত্রা।

পেটের স্বাস্থ্যের সঙ্গে ত্বকের উজ্জ্বলতার সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। তাই কোরিয়ান নারীরা রূপচর্চার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে সবচেয়ে বেশি জোর দেন:

  • ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার: এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং ত্বক উজ্জ্বল করে। কোরিয়ানরা নিয়মিত তাদের ডায়েটে সাইট্রাস জাতীয় ফল, বিভিন্ন ধরণের বেরি ও সবুজ শাকসবজি রাখেন।

  • কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট: ত্বক, চুল ও নখ তরুণ এবং সুস্থ রাখতে কোলাজেন প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরিয়ানরা নিয়মিত কোলাজেন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন, যা ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা ও হাইড্রেশন বাড়াতে এবং বলিরেখা দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

  • ওমেগা থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড: স্যামন ও ম্যাকেরেলের মতো ফ্যাটযুক্ত মাছে প্রচুর পরিমাণে ওমেগা থ্রি পাওয়া যায়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি ত্বক সুস্থ রাখে। কোরিয়ানরা যেহেতু প্রতিদিন পরিমাপমত মাছ খান না, তাই অনেকেই নিয়মিত ওমেগা থ্রি সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করেন।

  • চাল ধোয়া পানি ও ভাতের মাড়: ঐতিহ্যবাহী ঘরোয়া পরিচর্যা হিসেবে চাল ধোয়া পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে নেন কোরিয়ানরা। এটি ত্বক টানটান করে, বলিরেখা দূর করে এবং পিগমেন্টেশন কমায়। এছাড়া ভাতের মাড় দিয়ে চুল ধুলে চুল চকচকে হয় এবং চুল পড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।

কে-বিউটির জনপ্রিয় ৭ ধাপের স্কিন কেয়ার রুটিন কোরিয়ানদের স্কিন কেয়ার রুটিন মূলত ৭টি সুনির্দিষ্ট ধাপে বিভক্ত:

১. ডাবল ক্লেনজিং (Cleansing): প্রথম ধাপে অয়েল বেইজড ও ফোম ক্লেনজারের মাধ্যমে মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করা হয়। অয়েল ক্লেনজার ত্বকের অতিরিক্ত সিবাম ও মেকআপ দূর করে এবং ফোম ক্লেনজার ধুলোবালি পরিষ্কার করে। সময় নিয়ে নিচ থেকে ওপরে বৃত্তাকারে ম্যাসাজ করার পর হালকা গরম পানিতে ভিজানো পাতলা কাপড় দিয়ে মুখ মুছে নিতে হয়।

২. এক্সফোলিয়েশন (Exfoliate): ব্ল্যাকহেডস দূর করা ও ভেতরের উজ্জ্বলতা ফেরাতে ব্ল্যাক সুগার দিয়ে এক্সফোলিয়েট করা কোরিয়ান বিউটির অন্যতম কৌশল। হাতের আঙুল দিয়ে আলতোভাবে ম্যাসাজ করে চিনি গলে গেলে পর্যাপ্ত পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলতে হয়।

৩. টোনিং (Toning): ত্বকের পিএইচ (pH) ভারসাম্য বজায় রাখতে, রুক্ষতা কমাতে এবং ত্বক টানটান রাখতে কটন প্যাড দিয়ে টোনার ব্যবহার করা হয়। কোরিয়ান টোনারে বোটানিক্যাল উপাদান, হায়ালুরনিক অ্যাসিড, দুধ বা টি-ট্রি অয়েল জাতীয় প্রাকৃতিক উপাদান মিশ্রিত থাকে।

৪. অ্যাসেন্স প্রয়োগ (Essence): এটি কে-বিউটির একটি মূল উপাদান। মূলত ভেষজ বা উদ্ভিদের নির্যাস এবং ফারমেন্টেড উপাদান দিয়ে তৈরি ২-৩ ফোঁটা অ্যাসেন্স মুখে মেখে আলতো হাতে ম্যাসাজ করলে ত্বক ভেতর থেকে মেরামত হয় এবং গ্লো বাড়ে।

৫. শিট মাস্ক (Sheet Mask): প্যাকেটজাত এই মাস্কগুলো সিরাম বা অ্যাসেন্সে ভেজানো থাকে। অ্যালোভেরা, মধু, গ্রিন টি, টমেটো বা বেরি সমৃদ্ধ শিট মাস্ক মুখে ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে তা ফেলে দিতে হয়। এরপর মুখ ধোয়ার প্রয়োজন পড়ে না, যা কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ সুবিধাজনক।

৬. ময়েশ্চারাইজিং (Moisturizing): আগের সব ধাপের পুষ্টি ত্বকে আটকে রাখতে সঠিক ময়েশ্চারাইজার জরুরি। সুদিং জেল, ওভারনাইট মাস্ক, অ্যালোভেরা, ক্রিম বা স্নেইল এক্সট্রাক্ট (সামুকের নির্যাস) ও ভিটামিন ই সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার ত্বকের পোর ছোট করে ত্বককে মসৃণ ও পুষ্ট করে।

৭. সুরক্ষা বা সানস্ক্রিন (Protection): শেষ ধাপে রোদ থেকে ত্বক রক্ষা করতে মিনারেল বেইজড ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন অথবা দ্রুত মিশে যাওয়া কেমিক্যাল সানস্ক্রিন ব্যবহার আবশ্যক। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারে ত্বকে কালচে দাগ ও বলিরেখা পড়ে না।