ঢাকা থেকে বুড়িমারীগামী চলন্ত যাত্রীবাহী বাসে প্রসব বেদনা ওঠার পর নিরাপদে এক সুস্থ কন্যাসন্তান/ছেলে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এক নারী যাত্রী। অসাধারণ এই ঘটনাটিকে স্মৃতিময় করে রাখতে নবজাতক শিশুটিকে আজীবন নিজদের বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের বিরল ঘোষণা দিয়েছে পরিবহন কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তার গর্ভধারিণী মায়ের যাতায়াতও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করার কথা জানানো হয়েছে।
ব্যতিক্রমী ও মানবিক এই ঘটনাটি ঘটেছে ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’-এর ঢাকা থেকে বুড়িমারী রুটে চলাচলকারী একটি দূরপাল্লার বাসে। পরিবহন কর্তৃপক্ষের এমন হৃদয়স্পর্শী উদ্যোগ ইতোমধ্যে লালমনিরহাট জেলাজুড়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
ভোররাতে প্রসব বেদনা ও বাসেই নিরাপদ জন্ম আবিদা বেগমের পরিবার সূত্র জানায়, লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ফকিরপাড়া ইউনিয়নের রমনীগঞ্জ গ্রামের আবেদ আলীর গর্ভবতী মেয়ে আবিদা বেগম (২৮) পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে ঢাকা থেকে নিজ গ্রামে ফিরছিলেন। চিকিৎসকদের দেওয়া সম্ভাব্য প্রসবের নির্ধারিত সময়ের আরও প্রায় ২০ দিন বাকি ছিল। তবে গত ২৮ সেপ্টেম্বর (সোমবার) ভোররাতে বাসটি রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ করেই আবিদার তীব্র প্রসব বেদনা শুরু হয়।
পরিস্থিতির তাৎপর্য বুঝতে পেরে বাসের চালক ও সুপারভাইজার দ্রুত গাড়িটি নিরাপদ স্থানে থামান। পরবর্তীতে বাসে যাত্রী হিসেবে থাকা এক নারী ধাত্রীর দক্ষ সহযোগিতায় এবং অন্যান্য যাত্রীদের সর্বাত্মক উপস্থিতিতে নিরাপদে প্রসব সম্পন্ন হয়। জন্ম নেয় এক সুস্থ ও ফুটফুটে ছেলে শিশু। প্রসবের পর বাসের চালক, সুপারভাইজার ও সহযাত্রীদের মধ্যে আনন্দ ভাগ করে নিতে তাৎক্ষণিক মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
উপহার সামগ্রী প্রদান ও বাস কর্তৃপক্ষের ঐতিহাসিক ঘোষণা ঘটনার পর নবজাতক ও প্রসূতি মায়ের প্রতি মানবিকতার আরও এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’ কর্তৃপক্ষ। পরিবহনটির স্বত্বাধিকারী আলহাজ্ব দিপুর বিশেষ নির্দেশে বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে হাতীবান্ধার রমনীগঞ্জ গ্রামে ওই প্রসূতির বাড়িতে সরাসরি যান বাসটির সুপারভাইজার মজনু মিঞা। এ সময় বাস কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নবজাতকের জন্য বিশেষ উপহার হিসেবে একটি সুসজ্জিত দোলনা, বেবি বেড, মশারি ও প্রসাধনী সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, বাসে জন্ম নেওয়া এই শিশুটি আজীবন ‘আনাস এন্টারপ্রাইজ’-এর যেকোনো রুটের বাসে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবে। এ ছাড়া শিশুটি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তার মা-ও এই একই সুবিধা ভোগ করবেন। বাসের ব্র্যান্ড নামের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও স্মরণীয় সংযোগ রেখে পরিবারের পক্ষ থেকে নবজাতকের নাম রাখা হয়েছে ‘আনাস হাসান’।
পরিবার, বাস কর্তৃপক্ষ ও জনপ্রতিনিধির বক্তব্য শিশুটির নানা আবেদ আলী আবেগপ্লুত হয়ে বলেন, “চিকিৎসক বলেছিলেন আরও কিছুদিন সময় বাকি আছে, তাই মেয়েকে নিয়ে শান্তিতে বাড়ি ফিরছিলাম। কিন্তু পথেই আকস্মিক এই ঘটনা ঘটে। বর্তমানে আমার মেয়ে ও নাতি দুজনই সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। বাসের চালক, সুপারভাইজার ও সহযাত্রীরা সে রাতে যেভাবে এগিয়ে এসে সহযোগিতা করেছেন, তা আমরা কোনোদিন ভুলব না। নাতি বাসে জন্ম নেওয়ায় বাসের সঙ্গেই মিল রেখে তার নাম রেখেছি আনাস হাসান।”
আনাস এন্টারপ্রাইজের সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজার মজনু মিঞা জানান, “ভোররাতে গভীর অন্ধকারে মিঠাপুকুর এলাকায় প্রসূতির আকুল কষ্ট দেখে আমরা কালবিলম্ব না করে বাস থামিয়ে প্রসবের ব্যবস্থা করি। ঘটনাটি আমাদের বাসের মালিক আলহাজ্ব দিপু সাহেবকে জানানো হলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও অভিভূত হন। তিনিই শিশুটির আজীবন বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের এই ঘোষণা দেন এবং উপহারসামগ্রী আমাদের মাধ্যমে পরিবারটির কাছে পৌঁছে দেন।”
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে স্থানীয় ফকিরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজল রহমান খোকন বলেন, “ইউপি সদস্যের মাধ্যমে চমৎকার এই খবরটি পেয়েছি। চলন্ত বাসে শিশু জন্মের খবর ছড়িয়ে পড়লে বহু উৎসুক মানুষ তাদের একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করেন। বর্তমানে মা ও নবজাতক দুজনই বেশ ভালো আছেন। পরিবহন কর্তৃপক্ষের এই বিরল উদ্যোগ সত্যিই সমাজে এক নতুন প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত।”