দেশে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহে সংকট চলছে। এর মধ্যেই ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে নতুন দাম কার্যকর হলেও বাজারে নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি।
সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ১২ কেজির সিলিন্ডার কোথাও ২ হাজার ২০০, আবার কোথাও ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ফলে বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে ভোক্তাদের ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে।
বিইআরসি রোববার নতুন দাম ঘোষণা করে। এর আগে ১২ কেজির সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। নতুন দাম রোববার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতি কেজি এলপিজির দাম ১৫৩ টাকা ৬ পয়সা এবং অটোগ্যাসের দাম ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভোক্তারা বলছেন, অনেক এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় বা সরবরাহ না থাকায় রান্নার জন্য এলপিজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। এই সুযোগে কিছু ব্যবসায়ী নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রি করছেন।
জোয়ার সাহারার বাসিন্দা খালেদ সাইফুল্লাহ জানান, বিইআরসির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর সিলিন্ডার কিনতে গিয়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৬০০ টাকা বেশি চাওয়া হয়েছে। মিরপুরের বাসিন্দা মামুন আবদুল্লাহর অভিযোগ, একটি দোকানে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকা চাওয়া হয়েছে।
এলপিজি ব্যবসায়ীদের সংগঠন লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ এলপিজি ব্যবহার করেন। এর প্রায় ৮০ শতাংশ রান্নার কাজে ব্যবহৃত হয়। দেশের এলপিজির ৯৯ শতাংশই বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আমদানি করা হয়। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, সম্প্রতি আমদানি কমেনি।
লোয়াব জানিয়েছে, আগস্টে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। তাহলে বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হলো কেন—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, ২০ সেপ্টেম্বর থেকে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমাতে শুরু করে। শুরুতে প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো হলেও পরে তা ৫০ শতাংশের বেশি হয়। বিভিন্ন ডিপোতে ডিলারদের ট্রাক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে।
রাজধানীর বাইরে নারায়ণগঞ্জ, সাভারসহ বিভিন্ন এলাকাতেও একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা। অনেক দোকানে পর্যাপ্ত সিলিন্ডার নেই। আবার কোথাও নির্দিষ্ট কোম্পানির সিলিন্ডার কিনতে বাড়তি দাম দিতে হচ্ছে।
এক খুচরা ব্যবসায়ীর দাবি, বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে বলে সরকারি নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
সরবরাহ সংকটের কারণ খুঁজতে ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে পুরো মাসের দৈনিক আমদানি ও সরবরাহের তথ্য দিতে চিঠি দিয়েছে বিইআরসি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে তথ্য দিয়েছে। এসব তথ্য যাচাই করে বাজারে কৃত্রিম সংকট বা মজুতের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই করা হবে। সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলেও আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। লোয়াব সভাপতি আমিরুল হকও সরবরাহ বাড়ার আশা জানিয়েছেন।
এদিকে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম পর্যাপ্ত আমদানির পরও বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক হলে এলপিজির দামও কমে আসার কথা।
এখন বড় প্রশ্ন হলো—বিইআরসির নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পরও বাজারে অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধ হবে কবে এবং সরবরাহ সংকটই বা কত দিনে কাটবে। খাতসংশ্লিষ্টদের আশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সরবরাহ বাড়লে বাজারে বাড়তি দাম নেওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।