একদিকে এসএসসি পাস করার স্বপ্ন, অন্যদিকে কলেজের আঙিনায় পা রাখার অপেক্ষা। অথচ সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পেয়েও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করেনি প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী! যে বয়সে বই-খাতা হাতে নতুন ভবিষ্যৎ গড়ার কথা, সেই বয়সেই কেন শিক্ষার প্রচলিত পথ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে এত শিক্ষার্থী? শুধু তাই নয়, এবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছে প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন করে উদ্বেগ।

শিক্ষা বোর্ডের তথ্যমতে, এ বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৬২ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। অথচ একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করেছে মাত্র ৯ লাখ ৯৫ হাজার ২৩৪ জন। অর্থাৎ পাস করেও প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ২২৮ জন শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির আবেদন করেনি। সারা দেশে একাদশ শ্রেণিতে আসন রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ। কিন্তু আবেদনকারীর সংখ্যা ১০ লাখেরও কম হওয়ায় ফাঁকা পড়ে থাকতে পারে ৬০ শতাংশের বেশি আসন, যা গতবারের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি।

তবে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সরাসরি ঝরে পড়া হিসেবে দেখতে নারাজ শিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। তাদের মতে, শিক্ষার্থীদের কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতে পারে, কেউ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা বিভিন্ন কারিগরি ও পেশাভিত্তিক কোর্সে ভর্তি হতে পারে। আবার অনেকে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে পড়াশোনার পথও বেছে নিতে পারে। অর্থাৎ কলেজে ভর্তি না হওয়া মানেই যে তারা শিক্ষাজীবন থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, বিষয়টি এমন নয়।

কিন্তু এর পেছনে কি শুধু বিকল্প শিক্ষার পথ বেছে নেওয়ার বিষয়টিই কাজ করছে? নাকি উচ্চশিক্ষা শেষ করেও চাকরি না পাওয়ার অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মনে তৈরি করছে গভীর হতাশা? শিক্ষাবিদদের মতে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও অনাগ্রহও এর অন্যতম কারণ হতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন পড়াশোনা করেও যখন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা মিলছে না, তখন শিক্ষার্থীদের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগছে এত কষ্ট করে পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যতে তারা কী করবে? ডিগ্রি কিংবা মাস্টার্স পাস করেও অনেককে পিয়নের চাকরির জন্য আবেদন করতে দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনা সামনে আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।

সব মিলিয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন না করা প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থীর এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। এদিকে ভর্তি কার্যক্রম শেষে ২৪ সেপ্টেম্বর সারা দেশে একযোগে একাদশ শ্রেণির ক্লাস শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কলেজে আবেদন না করা শিক্ষার্থীদের কতজন বিকল্প শিক্ষার পথে এগিয়ে যায়, আর কতজন হারিয়ে যায় শিক্ষার মূল ধারা থেকে।