হেপাটাইটিস বি একটি মারাত্মক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত মানুষের লিভারে আক্রমণ করে ও দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ তৈরি করে। সময়মতো এই সংক্রমণ প্রতিরোধ বা চিকিৎসা না করা হলে লিভার সিরোসিস এবং এমনকি লিভার ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী জটিলতা দেখা দিতে পারে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, মাত্র কয়েকটি ডোজ টিকা নেওয়ার মাধ্যমেই এই রোগ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।
ক্যানসার প্রতিরোধী প্রথম টিকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে হেপাটাইটিস বি টিকাকে প্রায়শই বিশ্বের প্রথম ‘ক্যানসার প্রতিরোধী টিকা’ বলা হয়ে থাকে। কারণ, বিশ্বজুড়ে লিভার ক্যানসারের অন্যতম মূল কারণ হলো হেপাটাইটিস বি ভাইরাস। এই টিকা গ্রহণের মাধ্যমে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলে স্বাভাবিকভাবেই লিভার ক্যানসারের ঝুঁকিও শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) নবজাতক, শিশু এবং সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকা যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে এই টিকা নেওয়ার জোর পরামর্শ দেয়। বিশেষ করে আক্রান্ত মায়ের সন্তানকে জন্মের প্রথম ১২ ঘণ্টার মধ্যেই টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া অতি জরুরি।
কারা পাবেন এই সুরক্ষা বা টিকা?
-
শিশু ও কিশোর: জন্মের পর প্রতিটি শিশুরই হেপাটাইটিস বি টিকা পাওয়া নিশ্চিত করা দরকার। ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত যেসব শিশু বা কিশোরের আগে টিকা নেওয়া হয়নি, তাদেরও এই টিকা সম্পন্ন করা উচিত।
-
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক: আকান্ত ব্যক্তির যৌনসঙ্গী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্য, একাধিক যৌনসঙ্গী থাকা ব্যক্তি এবং যৌনরোগের চিকিৎসাধীন রোগীদের জন্য এই টিকা জরুরি।
-
স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী: চিকিৎসক, নার্স ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কর্মীসহ যাঁরা নিয়মিত রক্ত বা শরীরের তরলের সংস্পর্শে আসেন, তাঁদের সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি।
-
বিশেষ রোগে আক্রান্ত রোগী: দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগে আক্রান্ত ও ডায়ালাইসিস গ্রহণকারী, দীর্ঘস্থায়ী লিভারের রোগী, এইচআইভি (HIV) ও হেপাটাইটিস সি রোগী এবং ডায়াবেটিস রোগীদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া উচিত।
-
ভ্রমণকারী ও অন্যান্য: উচ্চ সংক্রমণ হারের দেশে ভ্রমণকারী বা সেখান থেকে শিশু দত্তক নেওয়া পরিবারগুলোর ক্ষেত্রেও এই টিকার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নির্দিষ্ট ঝুঁকি না থাকলেও সুরক্ষার স্বার্থে যেকোনো সুস্থ মানুষ এই টিকা নিতে পারেন।
কতটি ডোজ নিতে হবে এবং নিয়ম কী? সাধারণত হেপাটাইটিস বি টিকার মোট ৩টি ডোজ নিতে হয়: ১. প্রথম ডোজ: যেকোনো সময়ে নেওয়া যায় (নবজাতকের ক্ষেত্রে জন্মের পরপরই)। ২. দ্বিতীয় ডোজ: প্রথম ডোজ নেওয়ার অন্তত ২৮ দিন (১ মাস) পর। ৩. তৃতীয় ডোজ: প্রথম ডোজ থেকে অন্তত ১৬ সপ্তাহ পর (তবে শিশু গ্রহীতার বয়স কমপক্ষে ২৪ সপ্তাহ হতে হবে)।
যদি কোনো কারণে কোনো একটি ডোজ নির্ধারিত সময়ে নেওয়া না যায়, তবে নতুন করে আবার সব ডোজ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিলম্বিত বা বাকি থাকা ডোজটি যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে নিলেই চলে।
টিকা কি হেপাটাইটিস বি তৈরি করতে পারে? অনেকের ভুল ধারণা থাকলেও হেপাটাইটিস বি টিকা থেকে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র আশঙ্কা নেই। ১৯৮৬ সাল থেকে ব্যবহৃত আধুনিক টিকাগুলো ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি এবং এতে কোনো রক্তজাত উপাদান থাকে না।
তবে কারো শরীরে যদি আগে থেকেই ভাইরাসের উপস্থিতি থাকে, তবে টিকা সেই চলমান সংক্রমণ নিরাময় করতে পারে না। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমেই কেবল নিশ্চিত হওয়া যায় শরীরে বর্তমান সংক্রমণ আছে নাকি ব্যক্তি আগে সংক্রমিত হয়ে সুস্থ হয়েছেন। বিশ্বজুড়ে এ পর্যন্ত ১০০ কোটিরও বেশি ডোজ হেপাটাইটিস বি টিকা দেওয়া হয়েছে এবং এটি অত্যন্ত নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে প্রমাণিত। টিকা নেওয়ার জায়গায় সামান্য ব্যথা, লালচে ভাব বা সামান্য জ্বরের মতো মৃদু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, যা খুব দ্রুত সেরে যায়।