গভীর রাত। কপোতাক্ষ নদের জোয়ারের পানি নতুন তৈরি রিং বাঁধ ছুঁই ছুঁই করছে। আর একটু বাড়লেই পানি উপচে লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা। এমন পরিস্থিতিতে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে রাত কাটান সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাহুনিয়া-শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দারা। একপর্যায়ে বাঁধের ওপর দাঁড়িয়ে মোনাজাত করে সৃষ্টিকর্তার কাছে বাঁধ রক্ষার জন্য প্রার্থনা করেন তাঁরা।

সোমবার রাতের এ পরিস্থিতির আগে দিনভর ধসে যাওয়া বেড়িবাঁধ রক্ষায় কাজ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মাটি, বস্তা ও জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও সন্ধ্যার পর সংস্কার করা অংশ আবারও ধসে পড়ে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূল বাঁধের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

পরে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মূল বাঁধের পেছনে জিও টিউব দিয়ে রিং বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। জোয়ারের পানি ঠেকাতে রাতভর সেই বাঁধেই মাটি ও বালুর বস্তা ফেলার কাজ চলে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার দিনভর চার শতাধিক মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার কাজে অংশ নেন। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে সংস্কার করা অংশের বড় একটি অংশ আবার নদীতে বিলীন হলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এরপর স্থানীয় মসজিদ থেকে মাইকিং করে সবাইকে ঝুড়ি, কোদাল ও বস্তা নিয়ে বাঁধে আসার আহ্বান জানানো হয়।

রাতে জেনারেটরের আলোয় শুরু হয় মাটি ফেলা ও রিং বাঁধ তৈরির কাজ। নদীতে থাকা বালুভর্তি বলগেট থেকে পাইপের মাধ্যমে রিং বাঁধে বিছানো জিও টিউবের ভেতরে বালু ভরা হয়। স্থানীয়রাও বস্তায় মাটি ভরে বাঁধ মজবুত করার কাজে অংশ নেন।

স্থানীয় বাসিন্দা কেরামত আলী বলেন, জিও টিউবের ওপর মাটির বস্তা দিয়ে কোনো রকমে রাত পার করেছেন তাঁরা। জোয়ারের সময় বাঁধের ওপর সবাই মিলে মোনাজাত করে সৃষ্টিকর্তার কাছে সাহায্য চেয়েছেন।

রাত আটটার দিকে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন আশাশুনি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মিঠুন মৈত্র। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ভাঙন ও ঝুঁকিপূর্ণ অংশের পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন।

মিঠুন মৈত্র বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে এলাকা পরিদর্শনে এসেছেন তিনি। ভেঙে যাওয়া অংশে রিং বাঁধ দেওয়া হলেও সেটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সমন্বিতভাবে কাজ চলছে।

প্রতাপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু দাউদ ঢালী বলেন, রিং বাঁধটি আরও মজবুত করতে হবে। রাত একটার দিকে নদীতে পূর্ণ জোয়ার হয়। এরপর ভাটায় পানি নামতে শুরু করলে স্থানীয়রা বাড়ি ফিরে যান। রাতে বাঁধ রক্ষার কাজে তিন শতাধিক মানুষ অংশ নেন।

পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাশিদুল ইসলাম বলেন, ভাঙনকবলিত অংশে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপনের কাজ চলছে। মূল বাঁধের পেছনে রিং বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। ঝুঁকি কমাতে কাজ অব্যাহত থাকবে।

এর আগে সোমবার সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে কুড়িকাহুনিয়া-শ্রীপুর এলাকায় কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দেয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বাঁধের বড় একটি অংশ ধসে নদীতে পড়ে। এরপর স্থানীয় বাসিন্দারা স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু করেন। পরে পাউবোর কর্মকর্তারাও কাজে যোগ দেন। দিনভর চেষ্টা শেষে ধসে যাওয়া অংশে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব স্থাপন করা হলেও সন্ধ্যায় আবারও বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়ে।