নতুন লবণ মৌসুম শুরুর আগে সম্ভাব্য ঘাটতি মোকাবিলায় দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) জানিয়েছে, গত মৌসুমে উৎপাদন কম হওয়া এবং নতুন মৌসুমের শুরুতে সম্ভাব্য সংকটের আশঙ্কা থেকেই আমদানির সুপারিশ করা হয়েছিল।

তবে সরকারের এ সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ লবণচাষিরা। তাঁদের দাবি, দেশে বর্তমানে লবণের কোনো ঘাটতি নেই। কয়েক মাস লোকসানে লবণ বিক্রির পর চাষিরা যখন কিছুটা লাভের মুখ দেখতে শুরু করেছেন, তখন আমদানির অনুমতি দেওয়া হলে স্থানীয় বাজারে দাম কমে যেতে পারে।

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশে পরিশোধিত লবণের চাহিদা ধরা হয়েছে ২১ লাখ টন। এর মধ্যে ভোজ্য লবণের চাহিদা সাড়ে ৭ লাখ টন, শিল্প খাতে সাড়ে ৯ লাখ টন, মাছ চাষে ৩৭ হাজার টন এবং প্রাণিসম্পদ খাতে ৩ লাখ ৬ হাজার টন। সাধারণত দেশে নভেম্বর থেকে মে পর্যন্ত লবণ উৎপাদনের মৌসুম চলে।

বিসিকের লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেন বলেন, গত মৌসুমে লবণের উৎপাদন কিছুটা কম হয়েছিল। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ৪ লাখ ৯০ হাজার টন এবং বিভিন্ন মিলে ১ লাখ ৭৭ হাজার টন লবণ মজুত রয়েছে। দেশে প্রতি মাসে প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার টন লবণের চাহিদা রয়েছে। সে হিসাবে বর্তমান মজুত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলবে। এর আগেই নতুন মৌসুমের লবণ বাজারে আসার কথা।

তবে গত মৌসুমের শুরুতে প্রথম দুই মাসে উৎপাদন খুব কম হওয়ায় এবার ২০ থেকে ২৫ দিনের সম্ভাব্য ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। সেই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই আমদানির সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে কয়েকটি লবণ মিলের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রায় প্রতিবছরই সম্ভাব্য সংকটের কথা বলে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়। গত বছরও একইভাবে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, পরে তা বাতিল করা হয়। তাঁদের দাবি, তখন আমদানি ছাড়াই বাজারে কোনো সংকট দেখা দেয়নি। একশ্রেণির মিলমালিকের সুবিধার জন্যই অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, পরে আমদানির অনুমতিপত্র উচ্চমূল্যে বেচাকেনা হয় এবং এর প্রভাব পড়ে বাজারদরেও।

বাংলাদেশ লবণচাষি কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ জে এম সিয়াম বলেন, গত মৌসুমে প্রতি মণ লবণের উৎপাদন ব্যয় ছিল ৩২০ থেকে ৩৩০ টাকা। মৌসুমের শুরুতে চাষিরা ৪০ থেকে ৫০ টাকা লোকসানে লবণ বিক্রি করেছেন। পরে মৌসুমের শেষ দিকে দাম বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে প্রতি মণ ৩৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাঁর আশঙ্কা, এই সময়ে আমদানি হলে স্থানীয় লবণের দাম আবার কমে যাবে।

দেশে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, পটিয়া, কক্সবাজার, খুলনা ও ঝালকাঠিতে মোট ২৫১টি লবণ মিল রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি আধুনিক ভ্যাকুয়াম মিল। এসিআই সল্ট, মোল্লা সল্ট, ট্রিপল রিফাইনারি ইন্ডাস্ট্রিজ, কনফিডেন্স সল্ট, সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ও এসএ সল্ট—এই সাত প্রতিষ্ঠান ভ্যাকুয়াম পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন করে। ভোজ্য ও শিল্প খাতের লবণের বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশ লবণ মিলমালিক সমিতির নেতাদের তদবিরের পর চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিসিক লবণ আমদানির সুপারিশ করে। এর ভিত্তিতে গত সোমবার দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

অনুমোদন অনুযায়ী, ২৪৪টি মিলকে ৫৪৩ টন করে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং সাতটি ভ্যাকুয়াম মিলকে ২ হাজার ৫০০ টন করে মোট ১৭ হাজার ৫০০ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে জানা গেছে, ২৪৪টি মিলের মধ্যে ৮৬টি গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত কোনো ভোজ্য লবণ উৎপাদন করেনি।

বাংলাদেশ লবণ মিলমালিক সমিতির সভাপতি নুরুল কবির বলেন, সংগঠন পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈষম্য করা সম্ভব নয়। সম্ভাব্য সংকটের ঝুঁকি এড়াতেই সরকার আমদানির অনুমতি দিয়েছে।

বিসিকের লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেন বলেন, উৎপাদন সক্ষমতার ভিত্তিতে আমদানির বরাদ্দ দেওয়ায় অতীতে কয়েকজন মিলমালিক আদালতে গিয়েছিলেন। এমন ঘটনা দুবার ঘটেছে। এবার কোনো মিলমালিক আমদানির অনুমতিপত্র বিক্রি করলে তাঁর নিবন্ধন বাতিল করা হবে।