অতিরিক্ত সার নয়, সঠিক মাত্রায় সার প্রয়োগেই মিলতে পারে বড় সাশ্রয়। আলু চাষে রাসায়নিক সারের অতিরিক্ত ব্যবহার কমিয়ে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাঁচানোর উদ্যোগ নিয়েছে মুন্সীগঞ্জ কৃষি বিভাগ। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ মেনে জমির পুষ্টিমান ও আলুর জাত অনুযায়ী সার ব্যবহার করা গেলে চলতি মৌসুমে জেলাটিতে সাশ্রয় হতে পারে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন সার। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩১২ কোটি টাকা।

একসময় দেশের সর্বোচ্চ আলু উৎপাদনকারী জেলা ছিল মুন্সীগঞ্জ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে আলু উৎপাদনে রংপুর প্রথম, বগুড়া দ্বিতীয় এবং মুন্সীগঞ্জ রয়েছে তৃতীয় অবস্থানে। তারপরও দেশের আলুর জোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বিশেষ কিছু জাতের আলু উৎপাদনের জন্য এখনো আলাদা পরিচিতি রয়েছে জেলাটির। এখানকার প্রান্তিক কৃষকদের অন্যতম প্রধান অর্থকরী ফসলও এই আলু। প্রতিবছর প্রায় ৩৪ থেকে ৩৫ হাজার হেক্টর জমিতে হয় আলুর আবাদ।

কিন্তু অধিক ফলনের আশায় প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক সার প্রয়োগ করছেন অনেক কৃষক। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, মুন্সীগঞ্জে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে প্রায় ২ দশমিক ১১ মেট্রিক টন সার ব্যবহার করা হয়। অথচ জমির ধরন, মাটির পুষ্টিমান ও আলুর জাত বিবেচনায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সুপারিশকৃত মাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ৯৭ মেট্রিক টন। অর্থাৎ পরিমিত সার ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও অতিরিক্ত প্রয়োগে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, একই সঙ্গে ঝুঁকিতে পড়ছে মাটির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে কৃষকদের সুষম সার ব্যবহারে উৎসাহিত করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। শুধু অনুমানের ভিত্তিতে নয়, মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে জমির প্রকৃত পুষ্টির চাহিদা নির্ধারণ করে সার প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে জেলার ২০৬টি ব্লকে খামারি অ্যাপের মাধ্যমে প্রদর্শনী কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্লক থেকে সংগ্রহ করা ৮৪৭টি মাটির নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটে। প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক ও মাঠপর্যায়ের প্রদর্শনীর মাধ্যমেও চলছে কৃষকদের সচেতন করার কাজ।

কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বেশি সার দিলেই যে বেশি ফলন পাওয়া যাবে, এমন ধারণা থেকে কৃষকদের বেরিয়ে আসতে হবে। বরং জমির প্রয়োজন অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসামসহ প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগের পাশাপাশি জৈব সার ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। এতে একদিকে যেমন অপ্রয়োজনীয় খরচ কমবে, অন্যদিকে মাটির পুষ্টির ভারসাম্য ও উর্বরতাও বজায় থাকবে। দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন টেকসই করতেও সুষম সার ব্যবহারের বিকল্প নেই।

সব মিলিয়ে মুন্সীগঞ্জের আলু চাষে এখন লক্ষ্য শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং কম খরচে কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করা। কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ অনুসরণ করা গেলে এক মৌসুমেই প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন সার সাশ্রয়ের পাশাপাশি বাঁচতে পারে ৩১২ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থ। তাই আলু চাষে অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা কমিয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষির দিকে কৃষকদের এগিয়ে নেওয়াই এখন কৃষি বিভাগের প্রধান চ্যালেঞ্জ।