যে সাগর একসময় ছিল জীবিকার ভরসা, সেই সাগরেই এখন অনিশ্চয়তার ঢেউ। জালভরা মাছ নিয়ে ঘরে ফেরার স্বপ্ন দেখেন উপকূলের জেলেরা, কিন্তু দিনের পর দিন কাঙ্ক্ষিত মাছ না মেলায় ফিরতে হচ্ছে লোকসানের বোঝা নিয়ে। সংসারের খরচ মেটাতে ধারদেনা, আর সেই দেনা শোধ করতে গিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে শেষ সম্বল। বাগেরহাটের শরণখোলাসহ উপকূলজুড়ে জেলে, ট্রলারমালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের জীবনে এখন এমনই দুর্দশার ছায়া।

একসময় নিজের জাল আর ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতেন শরণখোলার মৎস্য ব্যবসায়ী সোহাগ বয়াতী। কিন্তু একের পর এক লোকসানে প্রায় ২০ লাখ টাকা দেনার দায়ে বিক্রি করতে হয় তার ব্যবসার প্রধান সম্বল। এখন অন্যের ট্রলারে শ্রমিক হিসেবে সাগরে যান তিনি, অথচ মাথার ওপর রয়ে গেছে আরও পাঁচ লাখ টাকার ঋণ। একই পরিণতি সোহরাব তালুকদারেরও; প্রায় ১৫ লাখ টাকা দেনার চাপে জাল-ট্রলার বিক্রি করে এখন তিনি ঋণগ্রস্ত এক জেলে শ্রমিক, যার বকেয়া দেনা প্রায় সাত লাখ টাকা।

শুধু এই দুই ব্যবসায়ী নন, মাছের আশায় সাগরে গিয়ে খালি হাতে ফেরা অনেক জেলের জীবনেই জমেছে ঋণের পাহাড়। মোরেলগঞ্জের সজিব হাওলাদার ও পিরোজপুরের আলামীন শিকদার জানান, ভাগে মাছ পেলে কোনোভাবে চলে সংসার, আর মাছ না মিললে ধারদেনাই হয়ে ওঠে একমাত্র অবলম্বন। এবারের মৌসুমে তাদের প্রত্যেকেরই দেনা হয়েছে এক থেকে দেড় লাখ টাকা। কেউ এক লাখ, কেউ দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন; সংসারের চাকা সচল রাখতে গিয়ে ক্রমেই কঠিন হচ্ছে দেনামুক্তির পথ।

জেলেদের এই সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিষিদ্ধ ট্রলিং, চিংড়ি জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, মাছ ধরায় বারবার নিষেধাজ্ঞা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বনদস্যু ও জলদস্যুদের উৎপাত মাছ আহরণকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। অন্যদিকে, সাগরে প্রতিটি ট্রিপের জন্য জ্বালানি, বরফ ও খাবার বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয় ট্রলারমালিকদের। কিন্তু প্রত্যাশিত মাছ না মিললে খরচ ওঠে না, আর সেই ঘাটতি পূরণে নতুন ঋণ নিয়ে আবারও ঝুঁকির সাগরে পাড়ি দিতে হয় তাদের।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয়েছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম। প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে টানা ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকায় কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে। নিষেধাজ্ঞার আগে মাছের আয় কম থাকায় অনেকেই ধারদেনা করে সংসার চালিয়েছেন, এখন কাজ বন্ধ থাকায় সেই ঋণ পরিশোধের সুযোগও সীমিত। মাছ রক্ষায় এই বিরতি জরুরি হলেও, এই সময়টুকুতে জেলেদের ঘরে খাবার জোগানোই হয়ে উঠেছে বড় দুশ্চিন্তা।

লোকসানের চিত্র কতটা গভীর, তা বোঝা যায় শরণখোলার ট্রলারমালিক হালিম বয়াতীর অভিজ্ঞতায়।
নিষেধাজ্ঞার আগে শেষ ট্রিপে তার ট্রলার পাঠাতে খরচ হয়েছিল তিন লাখ টাকা, আর মাছ বিক্রি করে আয় হয় সাড়ে চার লাখ টাকা। ট্রলারের ১৮ জন জেলেকে ভাগের টাকা দেওয়ার পরও সব ব্যয় মিটিয়ে মালিকের হাতে লাভ থাকেনি এক টাকাও। ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের ভাষ্য, প্রতি ট্রিপে তিন থেকে চার লাখ টাকা বিনিয়োগ করেও মাছ না পেলে মূলধন হারানোর আশঙ্কা থাকে; শেষ পর্যন্ত ঋণ শোধে বিক্রি করতে হয় জাল, ট্রলার, এমনকি বসতভিটাও।

এই সংকট মোকাবিলায় আপাতত সরকারি খাদ্যসহায়তার দিকেই তাকিয়ে উপকূলের জেলেরা। শরণখোলা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞাকালে নিবন্ধিত প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সহজ শর্তে ঋণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের ওপর। সাগরের সম্পদ রক্ষা আর জেলেদের জীবন-জীবিকা - দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ; কারণ জাল শুকিয়ে গেলে শুধু মাছ ধরাই থামে না, থমকে যায় উপকূলের হাজারো পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াইও।