উজ্জ্বল আলো, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা আর টাইমস স্কয়ারের ঝলমলে নিয়ন আলোর নিউইয়র্ক।  কিন্তু এই আধুনিক শহরের বুকেই এমন এক সম্প্রদায়ের বসবাস, যাদের জীবনযাপন বাইরের মানুষের কাছে রীতিমতো অবাক করার মতো। এরা হাসিদিক ইহুদি সম্প্রদায়। ধর্মীয় বিশ্বাস আর শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যই যাদের জীবনের কেন্দ্রবিন্দু। তাদের কিছু গোষ্ঠীতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কঠোরভাবে সীমিত। স্মার্টফোনের বদলে অনেকে ব্যবহার করেন বিশেষ ধরনের কোশার ফোন, যেখানে ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ নেই । আর আপনার সাথে তাদের দেখা হলে একটাই প্রশ্নও করবেন আপনি কি  ইহুদি , কারণ  বাইরের সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে নিজেদের ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে তারা অনেকটাই নিজেদের নির্দিষ্ট সামাজিক পরিবেশের মধ্যে জীবনযাপন করেন।

আর এই সম্প্রদায়ের নারীদের জীবনযাপনেও রয়েছে বেশ কিছু কঠোর ধর্মীয় রীতি। অনেক ঐতিহ্যবাহী গোষ্ঠীতে বিয়ের পর নারীরা নিজের মাথার চুল অন্য পুরুষের সামনে দেখান না। কেউ পরচুলা বা উইগ পরেন, কেউ স্কার্ফ কিংবা অন্য ধরনের মাথার আবরণ ব্যবহার করেন। আবার কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে বিয়ের পর মাথার চুল কামিয়ে ফেলার প্রথাও রয়েছে। দাম্পত্য জীবনেও রয়েছে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ। ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী মাসিক চলাকালীন  সময়ে স্বামীর কাছ থেকেও দূরত্ব বজায় রাখতে হয়। এমন কি তাদের একে অপরের হাতে কোন দেওয়া নেওয়াও নিষেধ ।  আর সন্তান নেওয়ার বিষয়টিও সবসময় শুধু স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয় না। পরিবার পরিকল্পনা বা সন্তান নেওয়া বন্ধ করার মতো বিষয়ে অনেক পরিবারে ধর্মীয় নেতার বা রাব্বির পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে এখানেই শেষ নয় তাদের কিছু ধর্মীয় রীতি যা  বাইরের মানুষের কাছে আরও বিস্ময়কর। পাপ মোচনের প্রতীকী রীতি হিসেবে কিছু হাসিদিক ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে পালিত হয় ‘কাপ্পারোট’। এই রীতিতে জীবন্ত মুরগি মাথার ওপর ঘোরাতে ঘোরাতে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। এরপর মুরগিটি দাতব্য কাজে দেওয়া হয়, আর অনেকে মুরগির পরিবর্তে অর্থ দান করেন।  তাদের শিক্ষাব্যবস্থাতেও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব অনেক বেশি। তোরাহ, তালমুদ ও তানিয়ার মতো ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ানো হয়। বিশেষ করে ছেলেদের শিক্ষায় ধর্মীয় পাঠের গুরুত্ব বেশি। আর খাবারের ক্ষেত্রেও রয়েছে কোশার বিধান মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার আলাদা রাখার মতো নিয়ম তাদের  পরিবারে কঠোরভাবে মানা হয়।

 আবার এই সম্প্রদায়কে ঘিরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে সামনে আসে আরেক অদ্ভুত ঘটনা। ৭৭০ ইস্টার্ন পার্কওয়ের কাছে নিউইয়র্কের কর্তৃপক্ষ একটি অবৈধভাবে খোঁড়া ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গের সন্ধান পায়। তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, সুড়ঙ্গটি প্রায় ৬০ ফুট দীর্ঘ ছিল। ঘটনাটি চাবাদ-লুবাভিচ সম্প্রদায়ের ভেতরের বিরোধকেও সামনে নিয়ে আসে। তাদের কিছু এলাকায় আবার নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তা দল, অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা এবং ধর্মীয় বিরোধ মেটানোর জন্য বেইত দিন-এর মতো ব্যবস্থাও রয়েছে।

নিউইয়র্কের মতো আধুনিক শহরের মাঝখানে থেকেও হাসিদিক সম্প্রদায়ের অনেক সদস্য প্রযুক্তি, পোশাক, শিক্ষা, পরিবার এবং ধর্মীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। বাইরে থেকে দেখলে তাদের অনেক নিয়ম অচেনা কিংবা অবাক করার মতো মনে হতে পারে। কিন্তু তাদের কাছে এগুলো শুধু নিয়ম নয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ধর্মীয় বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থার অংশ। আধুনিক নিউইয়র্কের ঝলমলে জীবনের একেবারে মাঝখানেই তাই গড়ে উঠেছে এমন এক সমাজ, যেখানে আজও ধর্মীয় অনুশাসনই ঠিক করে দেয় মানুষ কীভাবে পোশাক পরবে, কীভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করবে, কীভাবে দাম্পত্য জীবন কাটাবে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে পরিবারে সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তও কীভাবে হবে।